Transcription
পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম লাইব্রেরিতে ১ কোটি ৮০ লাখ বই আছে। কিন্তু ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র একটি বই। এটি কোন সাধারণ বই নয়। এর ওজন একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের সমান এবং এর পাতা উল্টাতে গেলে আপনার গায়ের ঘাম ছুটে যাবে। আর এর ভেতরে যেখানে অপেক্ষা করছে শয়তানের আধ মিটার লম্বা একটি জীবন্ত ছবি। ইতিহাস বলে এটি সন্ন্যাসীরা লিখেছে। কিন্তু কিং বদন্তি বলে এটি এক রাতে শয়তানের সাথে চুক্তি করে লেখা হয়েছিল। চলুন আজ ডুব দেওয়া যাক দ ডেভিল বাইবেলের অন্ধকার ইতিহাসে।
সুইডেনের ন্যাশনাল লাইব্রেরি হলো বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম বই সংগ্রহের কেন্দ্র। এই লাইব্রেরিতে অনেকগুলি অত্যন্ত বিরল এবং মূল্যবান বই রয়েছে। কিন্তু এই বিশাল আর্কাইভের মধ্যে একটি বই বাকি সবগুলোর চেয়ে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যার নাম হল কোডক্স কি গ্যাস। ল্যাটিন ভাষায় এর অর্থ হলো বিশাল বই এবং এটি সত্যিই তার নামের সার্থকতা প্রমাণ করে। প্রায় এক মিটার লম্বা একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের ওজনের সমান ভারী এবং এর মোট লেখার ক্ষেত্রফল এতই বিশাল যে তা দিয়ে একটি পুরো পাবলিক সুইমিং পুল ঢেকে দেওয়া যাবে। এটি বর্তমানে টিকে থাকা মধ্যযুগের সবথেকে বড় পান্ডুলিপি যা তৈরি হয়েছিল ১৩০০ শতাব্দীর শুরুর দিকে। হ্যাঁ, এটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং এই ধরনের বইয়ের মতো এতেও সম্পূর্ণ ল্যাটিন বাইবেল রয়েছে। কিন্তু এর বিশাল আকারের কারণে বাইবেল লেখা শেষ হওয়ার পরেও এতে অন্য কিছু লেখার জন্য প্রচুর জায়গা বেঁচে গিয়েছিল। তাই এর মধ্যে লেখা হয়েছে কিছু সাধারণ বিষয় যেমন চিকিৎসাশাস্ত্রের লেখা শোকবার্তা এবং একটি সম্পূর্ণ এনসাইক্লোপিডিয়া। কিন্তু বাকি যা লেখা আছে তা মোটেও সাধারণ নয়। এই বিশাল বইয়ের পাতার ভাজে লুকিয়ে আছে জাদুর মন্ত্র রহস্যময় সব সূত্র এবং ওঝা দিয়ে ঝাড়ফুক বা ভূত তাড়ানোর বিস্তারিত নির্দেশিকা এবং তারপরেই আছে এটি মানে শয়তানের আধ মিটার লম্বা একটি ছবি। এই ছবিটিকে অস্বাভাবিক বলা মানে ১৩০০ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে একে খাটো করে দেখা হবে। আর আমি শুধু তার পরনের ওই পলকার ডট দেওয়া অদ্ভুত পোশাকের কথা বলছি না। বর্তমান বিশ্বের লাইব্রেরিতে হাজার হাজার মধ্যযুগীয় পান্ডুলিপি পাওয়া যায়। কিন্তু সেগুলোর একটিতেও এর ধারে কাছে যাওয়ার মতো কিচ্ছু নেই। এর আকার এর বিস্তারিত বিবরণ এবং প্রথমেই বইয়ের মধ্যে শয়তানের একটি পূর্ণ পাতার ছবি অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত সব মিলিয়ে এটি অত্যন্ত নিয়ম বহির্ভূত। এর আকারের কারণে কোডাক্স গিগ্যাস এমনিতেই একটি বিখ্যাত বই হতে পারতো কিন্তু এই অদ্ভুত ছবিটির কারণে এটি প্রায় কিং বদন্তির মর্যাদা পেয়েছে এবং একটি খুব মানানশই ডাকনাম অর্জন করেছে দ্য ডেভিলস বাইবেল শয়তানের বাইবেল।
প্রশ্ন ওঠে কে এই ছবিটি এখানে আঁকলো এবং কেন? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো আমরা নিশ্চিতভাবে জানিনা। তবে একটি তত্ত্ব আছে বা বলা ভালো একটি কিংবদন্তি আছে। দেখুন গত গত আট শতাব্দী ধরে শুধু এই বইটি টিকেই থাকেনি। এর সাথে লোকমুখে চলে এসেছে একটি অত্যন্ত ভুতুরে গল্প। আজ থেকে ৮০০ বছর আগে তৎকালীন বোহেমিয়া মানে বর্তমান চেক রিপাবলিকের একটি প্রত্যন্ত মঠে একজন বেনেডিক্সটাইন সন্ন্যাসীকে এক জঘন্য অপরাধের জন্য মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এটি কোন সাধারণ মৃত্যুদন্ড ছিল না। এই দন্ডপ্রাপ্ত সন্ন্যাসীকে ইমিওর বা জীবন্ত দেওয়ালবন্দী করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। আপনি যদি ১৩০০ শতাব্দীর মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে খুব একটা না জেনে থাকেন তবে জানিয়ে রাখি ইমিউরমেন্ট মানে হলো কাউকে জীবন্ত অবস্থায় চারিপাশ থেকে দেওয়াল গেঁথে তার ভেতরে আটকে রেখে মেরে ফেলা। এই ক্ষেত্রে সন্ন্যাসীকে তার নিজের মঠের দেওয়ালের ভেতরেই ইট দিয়ে গেঁথে ফেলার কথা ছিল। তাই স্বাধীনতা পাওয়ার এক শেষ মরিয়া প্রচেষ্টায় সেই সন্ন্যাসী প্রতিজ্ঞা করলেন যে পৃথিবীতে তার শেষ রাতে তিনি মঠের সম্মানে এমন একটি বই তৈরি করবেন যা সাধারণ কোন বই হবে না। এটি হবে এমন এক বিশাল গ্রন্থ যা ধারণ করবে সমস্ত মানবজাতির জ্ঞান। একে আপনি ১৩০০ শতাব্দীর উইকিপিডিয়া হিসেবে ভাবতে পারেন। সেই রাতেই সন্ন্যাসী সরাসরি কাজে লেগে গেলেন। কিন্তু খুব বেশি সময় লাগলো না তার এটা বুঝতে যে এক রাতে পুরো একটি বই লেখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি নিজের ক্ষমতার চেয়ে একটু বেশি বলে ফেলেছেন। তাই সাহায্যের জন্য মরিয়া হয়ে তিনি হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা শুরু করলেন। কিন্তু তিনি এই প্রার্থনা ঈশ্বরের কাছে করেননি। তিনি এটি করেছিলেন সরাসরি নরকের উদ্দেশ্যে। আর শয়তানও যথারীতি হাজির হলো এবং সন্ন্যাসীর অমর আত্মার বিনিময়ে তৈরি করে দিল পৃথিবীর দেখা সর্বশ্রেষ্ঠ বই। এই বইটি ছিল কোডক্স কি গ্যাস। কথিত আছে বইয়ের আসল লেখকের মানে শয়তানের প্রতি শ্রদ্ধা হিসাবে সন্ন্যাসী পরবর্তীকালে শয়তানের ওই ছবিটি যুক্ত করেছিলেন।
আমি জানি আপনি কি ভাবছেন শয়তানের লেখা বই? সত্যিই। আপনি যদি অদ্ভুত দশের নিয়মিত দর্শক হন তবে জানবেন যে আমি স্বভাবতই কিছুটা সংশয়বাদী। কিন্তু এই অসাধারণ বইটির অতিপ্রাকৃত বা বলা ভালো নরকীয় উৎসকে ভুল প্রমাণ করা আপনার ধারণার চেয়েও কঠিন। কারণ কোডাক্স গিগাক্স এর গল্পের অনেক দিক সত্যিই বিভ্রান্তিকর। বইটিকে দিয়েই শুরু করা যাক। মধ্যযুগে একটি বই লেখা কোন ছেলে খেলা ছিল না। এটি ছিল অবিশ্বাস্যভাবে সময় সাপেক্ষ একটি কাজ। যার জন্য অনেক ভিন্ন ভিন্ন দক্ষতার প্রয়োজন হতো। লেখা, ছবি আঁকা, ধর্মতত্ত্ব এমনকি রসায়নবিদ্যাও জানতে হতো। আবার ধরুন লেখার জন্য কালি ফুরিয়ে গেলে আপনার মত তাদের কাছে অপশন ছিল না যে দৌড়ে গিয়ে দোকান থেকে কালি নিয়ে চলে আসবে। তাদের নিজেকেই সেটা মিশিয়ে তৈরি করতে হতো। এইসব কারণ এবং আরো অসংখ্য কারণে মধ্যযুগীয় পান্ডুলিপিগুলোর বেশিরভাগ বেশ কয়েকজন সন্ন্যাসী মিলে মাস বা বছর ধরে কাজ করে লিখতেন। কিন্তু কোডক্স গিগাস আলাদা। গবেষকরা এই বিশাল বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো অধ্যয়ন করেছেন এবং একটি মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মত সিদ্ধান্তে এসেছেন। অস্তিত্বে থাকা এই বৃহত্তম মধ্যযুগীয় পান্ডুলিপিটি সম্পূর্ণভাবে একজন মাত্র লিপিকরের লেখা যার দক্ষতা ছিল অসাধারণ। ছাপাখানা আবিষ্কারের আগের দিনগুলোতে একটি বইয়ের কপি বার করতে হলেও তা লিখেই নকল করতে হতো। এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য কাজ যা শারীরিক ও মানসিক উভয়ভাবেই ক্লান্তিকর। স্বাভাবিকভাবেই শব্দ বাদ পড়া, বানান ভুল এবং অন্যান্য ত্রুটি অত্যন্ত সাধারণ বিষয় ছিল। কিন্তু কোডক্স গিগাস একটি বিশাল পান্ডুলিপি। অথচ এতে উল্লেখযোগ্য কোন ভুলই নেই। অনুমান ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন যে এই আকার এবং জটিলতার একটি বই তৈরি করতে একজন লেখকের দৈনিক পরিশ্রমের প্রায় ৩০ বছর সময় লাগতো। যা একজন ব্যক্তির পক্ষে সম্পূর্ণ জ্ঞানের সাথে এতটা ধৈর্যের সাথে এতটা সময় ধরে লেখা অবিশ্বাস্যর চেয়েও বেশি কিছু বলা যেতে পারে প্রায় অসম্ভব। এখানে শুধু ভুলের অভাবই একমাত্র চোখে পড়ার মত বিষয় নয় হাতের লেখার গুণমানও দেখার মতো। এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস্যভাবে একই রকম। কয়েক দশকের সময়ের ব্যবধানে একজন লিপিকরের দৃষ্টিশক্তি শক্তি পেশি নিয়ন্ত্রণ সাধারণ স্বাস্থ্য এবং দক্ষতার স্তর সবকিছুই পরিবর্তিত হয় এবং তার হাতের লেখার উপরেও এর প্রভাব পড়ে। প্রভাবটি ছোট বা বড় হতে পারে। কিন্তু যেকোনো ফরেন্সিক হাতের লেখা বিশ্লেষক সেই পরিবর্তন ধরতে পারার কথা। কিন্তু কোডক্স গিগ এর ক্ষেত্রে এক নম্বর পৃষ্ঠার লেখা ৬২০ নম্বর পৃষ্ঠার লেখার থেকে একেবারেই আলাদা করা যায় না। কিন্তু যেমনটা আমরা জানলাম যে বৈজ্ঞানিক ধারণা হিসেবে বইটিকে কয়েক দশক ধরে লেখা হয়েছিল। এই সবকিছুকে একসাথে করুন। পান্ডুলিপির অবিশ্বাস্য আকার। এটি একজন মাত্র লিপিকরের লেখা এবং তার হাতের লেখার গুণমান, ধারাবাহিকতা ও নির্ভুলতা। আমরা কি এক সত্যিকারের রহস্যের মুখোমুখী হচ্ছি নাকি যিনি এই জিনিসটি তৈরি করেছেন তিনি ছিলেন প্রায় অতি মানবীয়? সাহস করে বলা যায় হয়তো আলৌকিক বা অতি প্রাকৃত।
এরপরেও আপনি যদি এখনো শক্তভাবে সংশয়বাদী বা অবিশ্বাসী দলের হয়ে থাকেন তবে আমি আপনাকে দোষ দেবো না। কিন্তু এখনই কোন তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন না। কারণ আরো কিছু বাকি আছে। এই ছবিটির দিকে তাকান। অদ্ভুত কিছু লক্ষ্য করছেন? কোডক্স গিগ্যাক্স ভেলাম বা পশুর চামড়ার উপরে লেখা। যা সম্ভবত বাছুরের চামড়া দিয়ে তৈরি। ভেলাম সাধারণত অফ হোয়াইট বা মলিন সাদা রঙের হয়। ঠিক যেমন কোডেক্স গিগ্যাক্স এর ভেতরের বাকি পৃষ্ঠা গুলো মানে বেশিরভাগ পৃষ্ঠা। কিন্তু এই ছবিতে আপনি স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছেন শয়তানের সেই অস্বস্তিকর ছবিযুক্ত পৃষ্ঠাটি আলাদা। এটি বাকিগুলোর চেয়ে অনেক বেশি কালো যেন মনে হচ্ছে এটি আগুনে ঝলসানো হয়েছে। অনেকেই মনে করেন এই ঝলসানো আগুন নরকের আগুন। হ্যাঁ বইটি একবার রহস্যজনকভাবে আগুন থেকে বেঁচে গিয়েছিল যে বিষয়ে একটু পরেই আসছি। কিন্তু আমরা যতটুকু জানি এর পৃষ্ঠাগুলো কখনো পড়েনি। এরপর আছে পেছনের মলাটে থাকা এই দুটি ধাতব ফিটিং। পন্ডিতরা বিশ্বাস করেন যে এগুলো ব্যবহার করে বইটিকে সবসময় টেবিলের সাথে শারীরিকভাবে আটকে বা শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। দেখুন আমি কোন লাইব্রেরিয়ান নই। কিন্তু কোন ধরনের বইকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখার প্রয়োজন হয়। সংশয়বাদী হন বা নাই হন আপনাকে স্বীকার করতেই হবে যে ব্যাপারটা একটু ভুতুরে। এবং এই ভুতুরে ভাব শুধু ব্যাখ্যাতিতভাবে কালো হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা বা জড়বস্তুকে শেকল পড়িয়ে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কারণ এই প্রাচীন গ্রন্থটির ৮০০ বছরের ইতিহাস বইটির মতই রহস্যময়।
শয়তানের লেখক হওয়ার বিষয়টি একপাশে সরিয়ে রেখে একদম শুরুতে ফিরে যাওয়া যাক। আসলে কেউ জানে না এই বিশাল বইটি কোথা থেকে এসেছে। কোডেক্সটির প্রথম নিশ্চিত মালিক ছিল পোডলাজিস নামক ছোট এক বোহেমিয়ার মঠের সন্ন্যাসীরা। দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহাসিকরা ধারণা করতেন যে বইটি এখানেই তৈরি হয়েছিল। আসলে বেশিরভাগ উৎস এখনো সেই দাবিই করে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে তারা সম্ভবত ভুল। ৮০০ বছর আগে কোডেক্স গিগ্যাক্স এর মত একটি বই তৈরি করা ছিল অসম্ভব কঠিন কাজ। এর পার্চমেন্ট বা কাগজ তৈরির জন্য ১৬০ টি পশুকে জবাই করতে হয়েছিল। এবং এর বিশাল বাধাই বা বাউন্ডিং শুধুমাত্র একজন দক্ষ কারিগরই তৈরি করতে পারতেন। এটি ছিল একটি অত্যন্ত উচ্চবিলাসী প্রজেক্ট এবং এর জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল। আসলে প্রচুর নয় বিশাল অংকের অর্থের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সুইডেনের ন্যাশনাল লাইব্রেরির গবেষকদের মতে পোর্ডলাজিস মঠটি ছিল অত্যন্ত গরিব। এই বিশাল মাপের একটি প্রজেক্ট হাতে নেওয়ার মত সম্পদ তাদের ছিল না। তাহলে কে করেছিল? এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের কাছে আসলে কোন ধারণাই নেই। কোডেক্স গিগাস শুরু থেকেই খুব বিখ্যাত একটি বই ছিল। একসময় একে বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য হিসেবে গণ্য করা হতো। অথচ কেউ জানে না কে এটি তৈরি করেছিল বা এটি কোথা থেকে এসেছে যেন এটি রাতারাতি কোথাও থেকে হঠাৎ উদয় হয়েছে। প্রথম কয়েকশো বছর কোডক্সটি বিভিন্ন মঠের হাতে ঘুরেছে কিন্তু ১৬০০ শতাব্দীর শেষের দিকে এর ক্রমবর্ধমান খ্যাতি রোমান সম্রাট দ্বিতীয় রুডলফভের নজরকারে। রুডলভ ছিলেন বিশ্বখ্যাত শিল্প সংগ্রাহক যার অতি প্রাকৃত বা গুপ্তবিদ্যা নিয়ে বিশাল রকমের আগ্রহ ছিল। চমৎকার অলংকরণ এবং শয়তানের নিজের এর তৈরীর গুজব সব মিলিয়ে কোডক্স গিগাক্স ছিল তার পছন্দের তালিকায় একদম উপরের দিকে। তাই তিনি এটি সংগ্রহ করলেন। আসলে তিনি ১৯৫৪ সালে মূলত এটিকে চুরি করেছিলেন এবং এটি দ্রুত তার সংগ্রহের রত্ন হয়ে ওঠে। যে সংগ্রহকে এখন সর্বকালের অন্যতম সেরা শিল্প সংগ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিন্তু অবাক করার বিষয় কি জানেন? শয়তানের বাইবেল হাতে পাওয়ার কিছুদিন পরেই দ্বিতীয় রুডলফ পাগল হয়ে যান। কিন্তু আরো বেশি অবাক করার বিষয় হলো রুডলফের পাগলামির ধরণ। তিনি প্যারানয়া বা অহেতুক সন্দেহে ভুগতেন এবং যখন তখন রেগে যেতেন। তিনি দাবি করতেন যে শয়তান তাকে ভর করেছে। বইটিকে সংগ্রহ করার সাথে সাথেই দ্বিতীয় রুডলফের এই আচরণ কি কাকতালীয় হতে পারে। কিন্তু অন্ধকারের প্রভুর দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে অর্ধেক ইউরোপ শাসন করা যে বেশ কঠিন তা বলাই বাহুল্য। তাই শেষ পর্যন্ত রুডলফ এতটাই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে তার নিজের ভাই তাকে ক্ষমতাচুত্ত করেন। সিংহাসনচুত সম্রাটকে প্রাক ক্যাসেলে বন্দি করে রাখা হয়। সাথে ছিল কোডক্স গিগ্যাক্স এবং তার বাকি সংগ্রহ। এর মাত্র ন মাস পরেই তিনি সেখানে মারা যান। কোডক্সটি স্টোর রুমে ফেলে রাখা হয় এবং কয়েক দশক ধরে সেখানেই পড়ে থাকে। কিন্তু এই ধরনের বই বেশিদিন বাক্সে বন্দি থাকার জিনিস নয়। দ্বিতীয় রুডলাপের মতোই সুইডেনের রানী ক্রিস্টিনা ছিলেন শিল্পের বিখ্যাত পৃষ্ঠপোষক এবং বইয়ের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। ৩০ বছরের যুদ্ধের শেষের দিকে তার জেনারেলরা বুঝতে পারলেন যে সারা ইউরোপ থেকে যুদ্ধের লুট হিসাবে মূল্যবান শিল্পকর্ম বিশেষ করে বই পাঠিয়ে তারা তরুণী রানীর অনুগ্রহ লাভ করতে পারেন। আর পুরো খ্রিস্টান জগতে কোডক্স গিগাক্স এর চেয়ে মূল্যবান কোন বই ছিল না। ১৯৬৮ সালে সুইডেন সেনাবাহিনী প্রাক শহরে আক্রমণ চালায়। যা ছিল যুদ্ধের শেষ পদক্ষেপ। এই পুরো আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্বিতীয় রুডলাফের সংগ্রহ এবং বিশেষ করে কোডেক্স গিগ লুট করা। সোজা কথায় এই জিনিসটার জন্য দেশগুলো আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধ করেছে।
রানী ক্রিস্টিনা কোডেক্স গিগাক্স কে স্টকহোমে তার প্রাসাদে রাখেন। যা ট্রে ক্রোনার বা তিন মুকুট নামে পরিচিত ছিল। বিশাল এই প্রাসাদটি প্রায় চার শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু কোডক্স আসার ৫০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুরো প্রাসাদটি পুড়ে মাটিতে মিশে যায়। প্রাসাদের লাইব্রেরির ৭৫ শতাংশ বই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। অথচ ৭৫ কেজি ওজন এবং সম্ভবত ডেস্কের সাথে শেকল দিয়ে বাঁধা থাকা সত্ত্বেও কোডক্স গিগাস বেঁচে যায়। কিভাবে? গুজব আছে যে কোন এক বলবান ব্যক্তি লাইব্রেরি পড়ার সময় কোন মতে এটিকে জালনা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলেছিলেন যা নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কোন এক বেচারা পথচারীর গায়ের উপর পড়েছিল। ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত আছে যে এই অংশটি আসলেই ঘটেছিল কিনা। তবে বইয়ের বাধাইয়ে এমন কিছু ক্ষতি দেখা যায় যা অনেক উঁচু থেকে পড়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যাই হোক ট্রে ক্রোনরের অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া বইগুলো শেষ পর্যন্ত। সুইডিশ ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে পুনর্বাসিত হয়। যেখানে কোডক্স গিগাক্স আজও পাওয়া যায়।
এই পর্যায়ে এটা বলা নিরাপদ যে এটি একটি জঘন্য রকমের অদ্ভুত বই। অজানা উৎস অতি প্রাকৃত দক্ষতাপূর্ণ লিপিকর কালো হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা পাগল সম্রাট তালিকা চলতেই থাকে। তাই আসুন সত্যিটা মেনে নিই। শয়তান নিজেই এসে এই জিনিসটা লিখেছেন। কিন্তু এটা বিশ্বাস করতে হলে খুব করা নেশায় বুধ হয়ে থাকতে হবে। যেহেতু সজ্ঞানেই আছি তাই চলুন একটু রহস্যের থেকে পর্দা তোলার চেষ্টা করি। সবথেকে ভুতুরে উপাদানগুলোর একটি দিয়ে শুরু করা যাক। শয়তানের ছবিযুক্ত এই অদ্ভুতভাবে কালো পৃষ্ঠাগুলো। আপনি হয়তো অনুমান করছেন যে ট্রে ক্রোনর প্রাসাদে অগ্নিকাণ্ডের সময় কোডেক্সের ওই পৃষ্ঠাটি খোলা ছিল। যে কারণে পৃষ্ঠাটি কালো হয়েছে। কিন্তু সত্যিটা আসলে এর চেয়ে সহজ। দেখুন আপনি যখন ভেলাম বা পশুর চামড়ার কাগজকে সূর্যালোকের সংস্পর্শে রাখবেন তখন এতে একটি বিশাল কালচে আভা বা প্যাটিনা তৈরি হবে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পুরো বই জুড়ে এই আভা সমানভাবে থাকার কথা। কিন্তু কোডক্স গিগ্যাক্সের এই নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা অন্যগুলোর চেয়ে অনেক বেশি বিখ্যাত। তাই এটি তার ভাগের চেয়ে অনেক বেশি সূর্যালোক পেয়েছে। শয়তানের কোডক্সের পাতা নরকের আগুনে কালো হয়নি। মানুষের শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা কৌতুহালের কারণেই ওতে দাগ পড়েছে। কোডক্সটি সবসময় শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। এই বিষয়টির ব্যাখ্যা আরো সহজ। দেখা যাচ্ছে এটি আসলে সেই সময়ের সাধারণ নিয়ম ছিল। সেই সময় সাধারণ বইগুলো অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। পুরো লাইব্রেরি ধরে বইগুলোকে তাদের তাকের সাথে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না। আর কোডক্স গিগাস্ত ছিল মূলত অমূল্য। তাই এটাকে তালা চাবি দিয়ে আটকে রাখাটাই ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। এরপর আছেন বেচারা বুড়ো দ্বিতীয় রুডলভ। কোডেক্স পাওয়ার কিছুদিন পরেই তিনি সত্যিই পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি হ্যাবাসবার্গ বংশের একমাত্র শাসক ছিলেন না যিনি তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন। হ্যাবাসবার্গ বংশ ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম হাস্যকরভাবে ইনব্রিড মানে নিজের আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে করার একটি পরিবার। আপনি হয়তো ইতিমধ্যেই ইনব্রিডের কারণে হওয়া স্লেজ হ্যামারের মত থুতনি লক্ষ্য করেছেন। মানসিক এবং শারীরিক সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা এই রক্তরেখাকে জর্জরিত করেছিল। বাকি রইল আগুনের কান্ড। কোডক্স থ্রি ট্রেনার প্রাসাদের আগুন থেকে বেঁচে যাওয়া অল্প কিছু বইয়ের মধ্যে একটি ছিল। কারণ সবথেকে দামি জিনিসগুলোকেই আগে বাঁচানো যৌতিক। তা সেগুলোর ওজন এক টন হলেও। আর এই বইটিকে নিয়ে তো যুদ্ধ হয়েছিল।
এবার প্রশ্ন আসে যে তাহলে কেউ কেন জানে না যে এই বইটিকে কে তৈরি করেছিল? এর কারণ এটি ৮০০ বছর পুরনো এবং মধ্যযুগ ঠিক রেকর্ড বা নতিপত্র সংরক্ষণের স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত নয়। আপনি হয়তো এখানে একটি প্যাটার্ন বা ধরণ লক্ষ্য করতে পেরেছেন। কোডক্সটিকে ঘিরে থাকা অদ্ভুত গল্পগুলো অবশ্যই এই বিশাল বইটিকে রহস্যের চাদরে মুড়িয়ে দেয়। কিন্তু এর যেকোনো একটিকে একটু কাছ থেকে পরীক্ষা করলেই একটি সম্পূর্ণ যৌতিক ব্যাখ্যা বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু কোডক্স গিগ্যাস কিভাবে এলো তার ব্যাখ্যা করবার জন্য কোন নারকীয় হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। মানে এই নয় যে এই বিশাল গল্পের কোন রহস্য নেই। কারণ শয়তান যদি নিজেই ধারালো নখ যুক্ত হাতে কোডক্স গিগ্যাক্স না লিখে থাকে তার মানে সাধারণ কোন রক্ত মাংসের মানুষই কোনভাবে এটি করেছিল। আপনার সামনে যে বইটি দেখছেন তা এক সত্যি সাধারণ ব্যক্তির সারাজীবনের কাজ। সেই ব্যক্তি কে ছিলেন তা আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানি না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে পান্ডুলিপিটি নিজেই সেই কিং বদন্তির সাথে মিলে একটি সূত্র দিতে পারে। কোডেক্স গিগাক্সের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় অন্যান্য জিনিসের মধ্যে হরমান ইনক্লুসাস নামক এক সন্ন্যাসীর জন্য একটি শোকবার্তা রয়েছে। যার ইংরেজি অনুবাদ করলে মোটামুটি দাঁড়ায় হরমান দ রিকক্লুস। যার বাংলা অর্থ নির্জনবাসী বা সন্ন্যাসী হরমান। এখানে বেশ খানিকটা অনুমান এবং ক্যালকুলেশন জড়িত। তবে কিছু পন্ডিত বিশ্বাস করেন যে এই নির্জনবাসী ঘরকুনো হরোমান হয়তো কোডেক্সটির মূল লেখক ছিলেন। কিন্তু যেহেতু আমরা অনুমান করছি চলুন আরো এক ধাপ এগিয়ে যাই। কারণ দেখা যাচ্ছে ল্যাটিন শব্দ ইনক্লুসাস অনুবাদের একাধিক অর্থ আছে। এর অর্থ বন্দি বা আবদ্ধ হতে পারে। তাহলে কি কিং বদন্তি সত্যি সেই সন্ন্যাসীর গল্প যে শাস্তি পেয়ে প্রার্থনার মাধ্যমে শয়তানকে দিয়ে বইটি লিখিয়েছিলেন? সত্যি হলো আমরা সম্ভবত কখনোই নিশ্চিতভাবে জানতে পারবো না। কিন্তু আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে যেই পালক কলম হাতে তুলে নিয়েছিল না কেন কোডক্স গিগ্যাক্স নিঃসন্দেহে সর্বকালের সেরা বইগুলোর মধ্যে একটি। এটি একটি সাহিত্যিক ক্যাথিড্রাল যা প্রায় অবিশ্বাস্যভাবে প্রতিভাবান এবং নিবেদিত প্রাণ এক ব্যক্তি একটি একটি শব্দ করে তৈরি করেছেন। অথবা এটি হয়তো খোদ শয়তানের লেখা প্রথম উপন্যাস। আপনি কোন শেষটিকে পছন্দ করছেন সেই সিদ্ধান্ত আমি আপনার উপরেই ছেড়ে দিলাম। তবে অবশ্যই কমেন্ট বক্সে জানিয়ে দেবেন। আপনার মতামত আমারও পড়তে ভালো লাগবে। আজ এইটুকুই। সুস্থ থাকবেন, আনন্দে থাকবেন।