Transcription
আগস্ট 2016 সকাল 9টার দিকে 11064 সালেম চেন্নাই এগমোর এক্সপ্রেস তামিলনাডুর সালেম রেলওয়ে স্টেশন থেকে চেন্নাই এগমোর রেলওয়ে স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। স্টেশনে অনেক হৈচয় ছিল এবং লোকেরা দ্রুত তাদের নির্ধারিত সিটে বসে পড়েছিল। চালক যেখানে রুটিন প্রারম্ভিক পরীক্ষাতে ব্যস্ত ছিলেন, সেখানে ট্রেনের গার্ড প্রতিটি বগির রুটিন পরিদর্শনে ব্যস্ত ছিলেন।
সালেম চেন্নাই এগমোর এক্সপ্রেস একটি যাত্রীবাহী ট্রেন যা প্রতিদিন সালেম স্টেশন থেকে ছেড়ে যায়, 14 টি স্টেশন অতিক্রম করে এবং পরের দিন সকালে এগমোর স্টেশনে পৌঁছায়। কিন্তু আজ এই ট্রেনটিতে বাক্সভর্তি দুটি পার্সেল কোচও যুক্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যে 226 টি সিল করা কাঠের বাক্স রাখা ছিল। এই বাক্সগুলোতে 100, 500 এবং 1000 টাকার হাজার হাজার নোট ছিল। এক দুই কোটি নয়, বরং পুরো 342 কোটি টাকা। আর এই সব নোটগুলো ছিল ময়লা এবং ছেড়া যা তামিলনাড়ুর বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া বা আরবিআই এর চেন্নাই শাখায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
যেমনটা আপনারা জানেন, ভারতে প্রতিদিন লাখ লাখ নোট মানুষের হাত দিয়ে আদানপ্রদান হয়। সময়ের সাথে সাথে অনেক নোট ছিড়ে যায়, নোংরা হয়ে যায় বা তাদের আয়ু শেষ হয়ে যায়। ব্যাংকিং ভাষায় এই ধরনের নোটগুলোকে সয়েলড কারেন্সি বলা হয়। এই নোটগুলোকে ব্যাংকে সংগ্রহ করা হয় এবং ব্যাংক থেকে আরবিআই এ পাঠানো হয়, যেখানে সেগুলি নষ্ট করে তাদের জায়গায় একই মূল্যের নতুন নোট ছাপানো হয়।
দুটি পার্সেল কোচের রাখা এই 342 কোটি টাকা সম্পূর্ণ সিল করা অবস্থায় ছিল এবং পার্সেল কোচের ঠিক পেছনের বগিতে এই টাকাগুলো নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার জন্য 18 জন পুলিশ অফিসার মোতায়েন করা হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর গার্ড সবুজ পতাকা দেখান এবং যাত্রীদের ও পার্সেল কোচ নিয়ে সালেম চেন্নাই এগমোর এক্সপ্রেস ধীরে ধীরে সালেম স্টেশন ত্যাগ করে। সাধারণ যাত্রীদের জন্য এটি একটি সাধারণ যাত্রাই ছিল। কেউ স্টেশনে তার আত্মীয়দের বিদায় জানাতে এসেছিল, তো কেউ নিজের ভাবনায় হারিয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেনটি পূর্ণ গতিতে বাতাসের সাথে কথা বলতে শুরু করে।
এইভাবেই ট্রেনটি দিন থেকে রাতে প্রবেশ করে আর রাত ধীরে ধীরে আরো গভীর হতে থাকে। কিছু মানুষ জানলার কাছে বসে ঠান্ডা বাতাস [মিউজিক] উপভোগ করছিল, আবার অনেকেই বাড়ি থেকে আনা খাবার খেতে ব্যস্ত ছিল। কিছু বাচ্চা তাদের মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত ছিল, আবার কেউ কেউ ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ছিল সম্পূর্ণ সতর্কতার সাথে বন্দুক হাতে। 18 জন পুলিশ সদস্য পার্সেল কোচের ঠিক পেছনের বগিতে বসে ছিলেন। কারো কোন ধারণাই ছিল না যে রাতের অন্ধকারে এই ট্রেনের ছাদে এমন পাঁচজন লোক চেপে বসে আছে যারা ভারতের ইতিহাসের সবথেকে বড় ট্রেন ডাকাতি করতে চলেছে।
ট্রেনটি শহর ছেড়ে নির্জন এলাকায় প্রবেশ করার সাথে সাথেই ট্রেনের ছাদে উপস্থিত পাঁচজন চোর চুপচাপ পার্সেল কোচের ছাদে পৌঁছে যায় এবং ব্যাটারি চালিত কাটার দিয়ে পার্সেল কোচের ছাদ কাটতে শুরু করে। চোরেরা অধীর আগ্রহে এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল বহুদিন ধরে। তারা স্টেশনগুলোতে সাবধানে পরিকল্পনা করছিল এবং ট্রেনের কোচ পজিশনিং, সিকিউরিটি ম্যানুয়াল এবং কোন দিন আরবিআই এর টাকা পাঠানো সেই সম্পর্কে তাদের কাছে সম্পূর্ণ তথ্য ছিল।
সালেম [মিউজিক] স্টেশন থেকে এগমোর স্টেশন যাওয়ার পথে বিরোধাচলম নামের একটি স্টেশন পড়ে। সেই সময় পর্যন্ত সালেম থেকে বিরোধাচলম পর্যন্ত কোন বৈদ্যুতিক রুটের সুবিধা ছিল না। তাই এই দুটি স্টেশনের মধ্যে সব ট্রেন ডিজেল ইঞ্জিনে চলতো। এরপর বিরুধাচলম স্টেশনে পৌঁছানোর পর ডিজেল ইঞ্জিনের জায়গায় বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন লাগানো হতো। বৈদ্যুতিক রুটের উপর উচ্চ ভোল্টেজের তার থাকে যার ফলে সামান্য ভুলেও কারেন্ট লাগার বড় ঝুঁকি থাকে। তাই পাঁচজন চোর জানতো যে তাদের যা কিছু করবার তা এই বৈদ্যুতিক রুটবিহীন এলাকার মধ্যেই করতে হবে। এই পুরো দৃশ্যটি ছিল একেবারে কোন সিনেমার দৃশ্যের মতো যেখানে একটি চলন্ত ট্রেনের ছাদে পাঁচজন চোর একটি বড় ডাকাতি করতে ব্যস্ত ছিল।
রাত 10টা 15 মিনিট। প্রায় পুরো ট্রেনের যাত্রীরা ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল। ট্রেনটি ঘন্টায় প্রায় 70 কিলোমিটার গতিতে বাতাসের সাথে কথা বলছিল। আর সেই গতির কারণেই কাটার মেশিনের শব্দও কোথাও হারিয়ে যাচ্ছিল। প্রতিটি সেকেন্ড ছিল চোরদের কাছে মূল্যবান। কারণ বিরোধাচলম আর বেশি দূর ছিল না। এইভাবে তারা ক্রমাগত তাদের কাটার চালিয়ে যেতে থাকে এবং ফলস্বরূপ তারা খুব শীঘ্রই পার্সেল কোচের ছাদে 2 ফুট লম্বা এবং 2 ফুট চওড়া একটি গর্ত তৈরি করতে সফল হয়। তাদের পাঁচজনের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং তারপর কোন শব্দ না করে তাদের মধ্যে দুইজন দড়ির সাহায্যে পার্সেল কোচের ছাদ থেকে নিচে নেমে যায়। সেখানে কাঠের বাক্সে রাখা ছিল কোটি কোটি টাকা।
[মিউজিক] নিচে নামার পর পরই দুই টাকা প্রথমে একটি বাক্সের তালা ভেঙে ফেলে এবং সব নোটগুলো একটি লুঙ্গিতে মুড়ে নিতে শুরু করে। বাক্সটি পুরোপুরি খালি হওয়ার পর তারা একে একে আরো তিনটি বাক্সের তালা ভাঙ্গে এবং সেগুলো থেকে নোট বের করে লুঙ্গিতে ভরে নেয়। এইভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই তারা এত টাকা লুট করে যে ওই নোটগুলো দিয়ে তাদের ছটি লুঙ্গি ভরে যায়। তাদের আরো টাকা লুট করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সময় ফুরিয়ে আসছিল। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিরোধাচলম স্টেশন আসার কথা ছিল। এই অবস্থায় টাকায় ভর্তি লুঙ্গিগুলো নিয়ে দুই চোর দড়ির সাহায্যে তাদের সঙ্গীদের সহায়তায় পার্সেল কোচের ছাদে উঠে পড়ে। এরপর পাঁচ ডাকাত অধৈর্য হয়ে ভেলুর ওভার ব্রিজের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। যেখানে তাদের কিছু সঙ্গী আগে থেকেই একটি ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভেলুর ওভার ব্রিজ বিরুদাচলম স্টেশন থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং ফাঁকা লাইনের কারণে ট্রেনটি এখানে গতি কমিয়ে দিত।
ট্রেনটি ভেলুর ওভার ব্রিজে পৌঁছানো মাত্র ওই পাঁচ ডাকাত প্রথমে তাদের টাকার ভর্তি লুঙ্গিগুলোর নিচে তাদের সঙ্গীদের কাছে ছুড়ে দেয় এবং তারপর ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে ভ্যানে উঠে মুহূর্তের মধ্যে পালিয়ে যায়। এত কিছুর পরে ওই ট্রেনটি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে এবং ঠিক পেছনের বগিতে বসে থাকা 18 জন পুলিশ সদস্য এই ঘটনার বিন্দু বিসর্গ জানতে পারেননি। এরপর রাত 11:00 টায় ট্রেনটি বিরুধাচলম স্টেশনে পৌঁছায় যেখানে ডিজেল ইঞ্জিন বদলে বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন লাগানো হয় এবং এইসব কাজে প্রায় এক ঘন্টা সময় লাগে কিন্তু তখনো এই ঘটনার কথা কেউ জানতে পারেনি। এরপর সালেম চেন্নাই এগমোর এক্সপ্রেস আবার তার যাত্রা শুরু করে এবং চেন্নাইয়ের এগমোর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছায়।
ট্রেন থামার সাথে সাথে স্টেশনে ব্যস্ততা শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে সব যাত্রী ট্রেন থেকে নেমে যায়। এরপর সেই 18 জন পুলিশ সদস্য ট্রেন থেকে নেমে রুটিন অনুযায়ী পার্সেল কোচের চারিপাশে দাঁড়িয়ে পাহারায় থাকে। তখনো [মিউজিক] তাদের কোন ধারণাই ছিল না যে টাকায় ভর্তি বাক্সগুলো লুট হয়ে গেছে। কয়েক ঘন্টা পর আরবিআই কর্মকর্তারাও টাকা নিতে সেখানে পৌঁছান। প্রথম পার্সেল কোচটি খোলা হয় যার মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিক ছিল এবং নোটের বাক্সগুলো ঠিকমতো সাজানো ছিল। কিন্তু [মিউজিক] আরবিআই কর্মকর্তারা দ্বিতীয় পার্সেল কোচের দরজা খোলার সাথে সাথেই ভেতরের দৃশ্য দেখে তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। ছাদে একটি বড় গর্ত দেখা যাচ্ছিল এবং সেই গর্ত দিয়ে আলো আসছিল। বাক্সগুলো এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল যা চুরি হওয়া নোটগুলোর সম্পূর্ণ সাক্ষ্য দিচ্ছিল। মেঝেতে 100, 500, 1000 টাকার অনেক পুরনো নোট ছড়িয়েছিল। এটা পরিষ্কার ছিল যে কেউ ট্রেনের ছাদ কেটে ভেতরে ঢুকেছিল এবং [মিউজিক] প্রচুর নোট নিয়ে চম্প দিয়েছে। এর ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্টেশনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাথে সাথেই ওই নোটগুলো গোনার কাজ শুরু হয়। গণনা শেষে দেখা যায় 5 কোটি 78 লক্ষ টাকা কম রয়েছে। এই কথা শোনা মাত্রই নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে খবর পাঠানো হয়। সেখানে উপস্থিত সমস্ত পুলিশ এবং আরবিআই কর্মকর্তাদের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। অবিলম্বে জিআরপি, আরপিএফ এবং স্থানীয় পুলিশকে এই লুটের বিষয়ে জানানো হয় এবং সালেম চেন্নাই এগমোর এক্সপ্রেসকে সাথে সাথে সিল করে দেওয়া হয়। এটি ছিল ভারতের ইতিহাসের সবথেকে বড় ট্রেন ডাকাতি যা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। যদিও টাকার পরিমাণ ছিল 5 কোটি 78 লক্ষ টাকা। কিন্তু চলন্ত অবস্থায় ট্রেনের ছাদ কেটে আরবিআই এর সিল করা ক্যাশ চালান থেকে টাকা বের করে নেওয়াটা নিজের মধ্যেই একটি মর্মান্তিক ঘটনা ছিল। দেশের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথমবার। আর প্রথমবারের মতো এমনটা হতে যাচ্ছিল যে একটি স্ক্যাম বা কেলেংকারির সমাধানের জন্য আমেরিকান স্পেস এজেন্সি নাসার সাহায্য নিতে হবে।
সবার প্রথমে গভার্মেন্ট রেলওয়ে পুলিশ মানে জিআরপি এবং তামিলনাড়ু পুলিশ এই ট্রেন ডাকাতির তদন্ত শুরু করে। ট্রেনের ছাদের দাগ, বাক্সের কভার, মেঝে সব জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। যখন গভীরভাবে তদন্ত করা হয়, তখন একটি জায়গা থেকে কিছু মানুষের আঙ্গুলের ছাপ এবং রক্তের ফোঁটা দেখতে পাওয়া যায়। দেখে মনে হচ্ছিল যে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে কোন ডাকাতের আঙ্গুল কেটে গেছে। এই নমুনাগুলো ফরেন্সিক বিশ্লেষণের জন্য পাঠানো হয়। এতে আশা জাগে যে ডাকাতরা শীঘ্রই ধরা পড়বে। কিন্তু ব্যাপক [মিউজিক] তদন্তের পরও আঙ্গুলের ছাপ বা রক্তের দাগ তামিলনাড়ুতে থাকা সক্রিয় কোন চোরের সাথে মেলেনি। ফলে কেসটির কোন অগ্রগতিও হচ্ছিল না।
কেসটিকে সমাধান করা এবং আরবিআইয়ের টাকা উদ্ধারের জন্য রেলওয়ের উপর চাপ বাড়ছিল। এই বিশাল ট্রেন ডাকাতির খবর, খবরের কাগজ এবং টেলিভিশন চ্যানেলে শিরোনাম তৈরি করছিল। নিউজ রিপোর্টাররা এগমোর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিলেন। কেউ কেউ সন্দেহ করছিল যে এর সাথে রেলওয়ে এবং আরবিআই এর কর্মচারীরা জড়িত থাকতে পারে। এই কারণে সিকিউরিটি স্টাফ, আরপিএফ জাওয়ান, সুপারভাইজার এবং লোডিং স্টাফ এদের দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু তারা কারো বিরুদ্ধেই কোন প্রমাণ পায়নি। সমস্যাটি হলো এই ঘটনার কোন সিসিটিভি ফুটেজ ছিল না এবং এই ঘটনার কোন প্রত্যক্ষদর্শীও ছিল না। তাই কেসটি অত্যন্ত কঠিন ছিল। এই কারণেই মাত্র দুইদিন পর 11ই আগস্ট 2016 তে এই কেসের দায়িত্ব তামিলনাড়ুর সিবিসিআইডির হাতে তুলে দেওয়া হয়। এসডিএসপি সিন্দিল কুমারানকে এই তদন্তের প্রদান করা হয় এবং ডিএসপি কৃষ্ণানকে ফিল্ড অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সিবিসিআইডির আরো অনেক কর্মকর্তা এই কেসের সমাধানের জন্য দিন-রাত কাজ করেন। সিবিসিআইডি প্রথমে পুলিশের সংগ্রহ করা তথ্যগুলো আবার যাচাই করে এবং ক্রাইম সিনের ভৌত প্রমাণগুলো পুনরায় পরীক্ষা করা হয়। যে যন্ত্রপাতি দিয়ে ট্রেনের ছাদে দুই ফুট গর্ত করা হয়েছিল সেগুলো খোঁজার চেষ্টা করা হয়। যে বাক্সগুলো সম্পূর্ণ খালি ছিল বা সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল সেগুলো বিশদভাবে তদন্ত করা হয়। শুধু তাই নয় সালেম ও এগোড়ের মধ্যে 350 কিলোমিটার রুটে ট্রেনটি চালানো হয়েছিল। সেই পথের সমস্ত স্থানীয় থানাকে সতর্ক করা হয় ও রুটের রেলওয়ে স্টেশনগুলো থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু এর কোনটি কাজে আসেনি এবং তদন্তকারীদের হাত সম্পূর্ণ শূন্যই থেকে যায়। এই কেসের সবথেকে বড় সমস্যাটি ছিল যে চুরি হওয়া নোটগুলোর সিরিয়াল নাম্বার কোথাও রেকর্ড করা ছিল না। তদন্তকারীদের জন্য চুরি হওয়া টাকা ট্র্যাক করা প্রায় অসম্ভব ছিল। এই পরিস্থিতিতে তাদের প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের পাশাপাশি পরিস্থিতিগত প্রমাণের উপর নির্ভর করতে হয়।
তদন্ত অনুযায়ী সিবিসিআইডির দল বেশ কয়েকটি রাজ্য পরিদর্শন করে এবং তারা 2000 এরও বেশি মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিন্তু তারা কোন শক্ত তথ্য পাননি। এইভাবে প্রায় দু বছর কেটে যায় কিন্তু এই কেসের সমাধানের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। চোরেরা খোলা বাতাসে শ্বাস নিচ্ছিল এবং তদন্তকারী দলের প্রতিটি পদক্ষেপ ব্যর্থ হচ্ছিল। সবদিক থেকে ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে সিবিসিআইটি এই সমস্যার সমাধানে আইটি বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া শুরু করে। আইটি বিশেষজ্ঞদের কাজ দেওয়া হয়েছিল 8 ও 9ই আগস্ট 2016র রাতে। সালেম এবং চেন্নাই এর মধ্যে সালেম চেন্নাই এগমোর এক্সপ্রেসের চলার সময় সক্রিয় থাকা সমস্ত মোবাইল নাম্বারের ডেটা বের করার ডেটা বিশ্লেষণের সময় এমন কিছু মোবাইল নাম্বার সামনে আসে যেগুলো ট্রেনের গতির সাথে সাথে তাদের লোকেশন পরিবর্তন করছিল অর্থাৎ এই নম্বরগুলো একই রুটে চলছিল এবং এর মধ্যে কয়েকটি নম্বর ট্রেনের গতির সাথে সাথে তাদের লোকেশন পরিবর্তন করছিল। নম্বরগুলোর বিস্তারিত তথ্য বের করলে দেখা যায় যে এগুলো সবই মধ্যপ্রদেশের একটি এলাকা থেকে ইস্যু করা হয়েছিল। কিন্তু শুধু মোবাইল নাম্বার ট্র্যাক করে এটা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল না যে এই লোকগুলোই ট্রেন ডাকাতির পেছনে ছিল। কারণ সেদিন ট্রেনে ভ্রমণকারী হাজার হাজার যাত্রীর মধ্যে এই নাম্বারগুলো যে কারো হতে পারতো। বিষয়টি তখনো অসম্পূর্ণ ছিল। তাই কেসটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সিবিসিআইডি মার্কিন স্পেস এজেন্সি নাসার সাহায্য নেয়। নাসার দল সেই রাতে সালেম ও চেন্নাইয়ের মধ্যবর্তী এলাকার দিকে মনোযোগ দেয়। এই পর্যায়ে হাই রেজুলেশনের স্যাটেলাইট ছবি চাওয়া হয় এবং সেই ছবিগুলোর অত্যন্ত গভীর বিশ্লেষণ করা হয়। যাত্রাপথে ছবিগুলোতে ট্রেনের ছাদে বেশ কিছু মানুষের মত আকৃতি দেখা যায়। বিশেষ বিষয় হলো এই আকৃতিগুলো। বিরোধাচলমের আশেপাশে হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে যায়। অর্থাৎ এটা পরিষ্কার ছিল যে ডিজেল ইঞ্জিন বদলানোর আগেই এই চুরিটি করা হয়েছিল। এইভাবে ধীরে ধীরে এই কেসের জট একে একে খুলতে শুরু করে।
মোবাইল ডেটা এবং স্যাটেলাইটের দৃশ্যাবলী একত্রিত করে সিবিসিআইডি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে এই ট্রেন ডাকাতিতে প্রায় 11 জন জড়িত ছিল এবং তারা সবাই সন্দেহভাজন। এরপর সিবিসিআইডি এই চোরদের গ্রেপ্তার করার প্রস্তুতি শুরু করে। তারা মধ্যপ্রদেশ পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে। এই পুরো কেসের আপডেট দেয় এবং চোরেদের গ্রেপ্তার করতে তাদের সাহায্য চায়। এর ফলে ডাকাতির প্রায় আড়াই বছর পর 12 ই অক্টোবর 2018 সালে সিবিসিআইডি মধ্যপ্রদেশের রথ লামের বাসিন্দাদের গ্রেপ্তার করে। তামিলনাড়ুর চেন্নাই থেকে দিনেশ পারদ এবং রেহান পারদ কে গ্রেপ্তার করা হয়। উভয়কেই হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রথমে তারা দুইজনই নানা কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ নিতেই তারা ভেঙে পড়ে এবং স্বীকার করে যে তারা এই ট্রেন ডাকাতির সাথে জড়িত ছিল। জিজ্ঞাসাবাতে জানা যায় যে এই ট্রেন ডাকাতিটি করেছিল পার্থি গ্যাং এবং এর নেতা ছিল মোহন সিং পার্থি।
এরপর সিবিসিআইডি মধ্যপ্রদেশে যায়। সেখানে জানা যায় যে এই কেসের অন্য সব অভিযুক্তরা আগে থেকেই এখানকার অন্যান্য জেলে বন্দী রয়েছে। এরপর সিবিসিআইডি মধ্যপ্রদেশ পুলিশের সাথে সমন্বয় করে মহেশ বারদি এবং কৃষ্ণা অরফে কালিয়াকে গুনাহ সেন্ট্রাল জেল থেকে এবং বজ্রমোহন পরাধীকে অশোকনগর জেল থেকে চেন্নাইতে নিয়ে আসে আরো তদন্তের জন্য। পারধি গ্যাং এর প্রধান মোহন সিং পারধীর বাড়ি ছিল মধ্যপ্রদেশের গুনায়। সে তার আত্মীয় কৃষ্ণা হরফে কালিয়ার সাথে মিলে অপরাধ জগতে পা রাখে। অতীতে মোহন সিং তার স্ত্রী, সন্তান এবং আত্মীয়স্বজনদের খুনের সাথেও জড়িত ছিল। এরপর সে রাজস্থান, দিল্লি, হরিয়ানা, গুজরাট, মহারাষ্ট্র এবং জম্মু ও কাশ্মীর সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড ঘটায়। পুলিশ তার গ্যাংকে অনুসরণ করে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায়। মোহন সিং। এরপরেও দুইজন গ্যাং মেম্বারকে হত্যা করে। তারপর মোহন সিংহ এবং তার গ্যাং জম্মু কাশ্মীরের একটি পরিবারের পাঁচ জনকে হত্যা করেছিল এই পরিস্থিতিতে অনেক রাজ্যের পুলিশ তার পেছনে লেগেছিল তাই গ্রেপ্তারের ভয়ে মোহন সিংহ তার গ্যাং নিয়ে পালিয়ে দক্ষিণ ভারতে চলে যায় এবং আত্মগোপনের জন্য বিভিন্ন জায়গায় থাকতে শুরু করে।
তদন্ত চলাকালীন জানা যায় যে মোহন সিংহ 2016 সালে তার গ্যাং নিয়ে তামিলনাডুর সালেমে যায় এবং রেললাইনের কাছাকাছি কুড়েঘরে [মিউজিক] থাকতে শুরু করে পুলিশের চোখ এড়াতে এরা সবাই শ্রমিকের ছদ্্যবেশ ধারণ করে সমাজে মিলে যায় এবং খুব চালাকি করে ছোটখাটো ডাকাতি করতে থাকে। এরই মধ্যে মোহন সিংহের সাথে সালেমের একটি স্থানীয় গ্যাং এর পরিচিতি হয়। যাদের কাছ থেকে সে আরবিআইতে পাঠানো নোংরা এবং পুরনো নোট সম্পর্কে জানতে পারে। সে এটাও জানতে পারে যে এই টাকা কখন এবং কিভাবে কোন ট্রেনে করে পাঠানো হয়। এরপর মোহন সিং ব্যাংকের টাকা লুট করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তার গ্যাং এর সাথে মিলে ট্রেনের রুটের সম্পূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে অযোধ্যাপটনাম এবং বিরুদ্ধচলম স্টেশনগুলির মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে রুট পর্যবেক্ষণ করে। এরপরে বহুদিন ধরে সে সালেম চেন্নাই এগমোর এক্সপ্রেসের রুটটিও ভালোভাবে পরীক্ষা করে। এরই মাধ্যমে পরাধী গ্যাং জানতে পারে যে অযোধ্যাপটনাম এবং বিরুদ্ধাচলমের মধ্যে এই ট্রেনের গতি বেশ স্থির থাকে এবং সালেম ও বিরোধাচলমের মধ্যে কোন বৈদ্যুতিক লাইনও নেই। এই সময়ে ট্রেনটি ডিজেল ইঞ্জিনে চলে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মোহনসিং পারাজি বৃন্দাচলম স্টেশনের কয়েক কিলোমিটার আগে ট্রেন লুট করার পরিকল্পনা করে এবং 8ই আগস্ট 2016 সালের রাতে সে তার সঙ্গীদের নিয়ে চলন্ত ট্রেনের ছাদ কেটে 5 কোটি 78 লাখ টাকা লুট করে পালিয়ে যায় কিন্তু কথায় আছে খারাপ কাজের ফল সবসময় খারাপই হয় পরাধী গ্যাং এর সাথে ঠিক এমনটাই হয়েছিল।
পরাধী গ্যাং এই টাকা ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারেনি কারণ এই লুটের মাত্র তিন মাস পর 8ই নভেম্বর 2016 সালে ভারত সরকার কালো টাকা শেষ করতে নোটবন্দি বা ডিমনিটাইজেশন ঘোষণা করে। ততদিনে পরাধী গ্যাং শুধুমাত্র কিছু সম্পত্তি এবং কিছু জিনিসপত্র কিনতে পেরেছিল। আর এইভাবেই নোটবন্দির পর তাদের কাছে থাকা পুরনো 500 এবং হাজার টাকার নোটগুলো মূল্যহীন হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে পারদ গ্যাং তাদের অবশিষ্ট কোটি কোটি টাকা পুড়িয়ে ফেলে। মোহন সিং তার গ্যাং নিয়ে মধ্যপ্রদেশে ফিরে যায় এবং কিছুদিন পর অন্য একটি মামলায় জেলে বন্দী হয়। এরপর তাকে এবং তার সঙ্গীদের সিবিসিআইডি ট্রেন ডাকাতির মামলায় গ্রেপ্তার করে তামিলনাড়ুতে নিয়ে আসে। এভাবেই ভারতের সবথেকে বড় ট্রেন ডাকাতির রহস্য সমাধান হয়।
এই ট্রেন ডাকাতি ট্রেনের নিরাপত্তার অনেক বড় ফাকফোকর ফাঁস করে দিয়েছিল। তাই এরপর রেলওয়ে এবং আরবিআই উভয়কেই তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে বাধ্য হতে হয়। উচ্চমূল্যের নগদ চালানের জন্য আরো কঠোর নিয়ম তৈরি করা হয়। এরপর থেকে যে কোচে টাকা রাখা হতো সেই কোচেই পুলিশের বসার ব্যবস্থা করা শুরু হয়। সিসিটিভি নজরদারী এবং জিপিএস ট্র্যাকিং এর মত পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়। ট্রেনের রুটগুলোর রিক্স ম্যাপিং করা শুরু হয় এবং নন ইলেকট্রিফাইড রুটগুলোকে আরো সুরক্ষিত করা হয়। অতিরিক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। দুর্ভাগ্যবসত আমাদের দেশের আইনি ব্যবস্থা অপরাধীদের জন্য বিভিন্ন ফাঁকপোকরে ভরপুর। আর এটাই কারণ যে এই ট্রেন ডাকাতির মাস্টারমাইন্ড মোহনসিং পারধি প্রমাণের অভাবের কারণ দেখিয়ে 2021 সালে জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়। জেল থেকে বের হওয়ার পর সে আরো অনেক অপরাধমূলক কাজ করে এবং বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে তার বিরুদ্ধে অবৈধ নির্মাণ, ডাকাতি এবং হত্যার মত অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। হত্যা সহ গুরুতর অপরাধের জন্য তার বিরুদ্ধে 50 টিরও বেশি এফআইআর মামলা রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো সে আজও পুলিশের ধোঁয়াচোয়ার বাইরে। প্রশ্ন ওঠে যে যদি 50 টি এফআইআর থাকা একজন ব্যক্তি প্রমাণের অভাবে মুক্তি পেয়ে যায় তবে একজন সাধারণ মানুষ কার কাছে বিচারের আশা করবে।
আজকের ভিডিওটি এইটুকুই। যদি ভালো লাগে অবশ্যই আপনার মতামত কমেন্ট বক্সে জানাবেন। পাশাপাশি নেক্সট কোন বিষয়ে ভিডিও দিলে আপনারা পছন্দ করবেন তাও কমেন্ট বক্সে জানাবেন। ভিডিওটিকে লাইক করবেন এবং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন। পাশাপাশি চ্যানেলটিকে সাবস্ক্রাইব না করে থাকলে অবশ্যই সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনটিতে প্রেস করে নেবেন। আমরা খুব তাড়াতাড়ি ওয়ান মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার হিট করতে চলেছি আর সেটা পসিবল হবে যদি আপনি সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনে প্রেস করে নেন। সর্বশেষে থ্যাংকস ফর ওয়াচিং।