Transcription
আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। রাব্বিশহ সদস। আজকে আমরা কোরআন মাজিদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূরা নিয়ে আলোচনা করব। এই সূরাটি নিজের নামেই হচ্ছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সূরাটির নাম হচ্ছে সূরা আল কদর।
সূরা আল কদর সম্পর্কে সংক্ষেপে আমরা যদি জানতে চাই তাহলে দেখব যে এই সূরাটি খুবই ছোট একটি সূরা। এটি আমপারার একটি সূরা, যেটা হচ্ছে পাঁচটা আয়াত মাত্র রয়েছে। কোরআন মাজিদের ক্রমাণ্যয় অনুযায়ী এই সূরাটি হচ্ছে 97 নাম্বার সূরা। অর্থাৎ 114 টি সূরার মধ্যে এটা হচ্ছে 97 তম সূরা কোরআনের।
আর নাজিলের দিক থেকে আমরা যদি চিন্তা করি, এটিকে মাক্কী সূরা বলা হয়ে থাকে। অধিকাংশ তাফসীরগণের মতে এটি মাক্কী সূরা এবং এটি নাযিল হয়েছে মাক্কী জীবনের প্রথম দিকে। এটাকে ক্রমান্যয় অনুযায়ী নাযিলের ক্রমান্বয় অনুযায়ী এটাকে 25 নাম্বার সূরা বলা হয়ে থাকে। এই সূরার আগের যে সূরাটি সেটি হচ্ছে সূরা আবাসা। এরপরে হচ্ছে সূরা আল কাদর। তারপরে সূরা আশশাম। সূরা আল বুরুজ। এভাবে ক্রমাণ্যয়ে এই সূরাগুলো নাযিল হয়েছে। স এখানে আমরা দেখি যে সূরা আল কদরের আগে হচ্ছে সূরা আল আরাসা নাযিল হয়েছে এবং সূরা আশশামস, সূরা আল বুরুজ এর পরবর্তীতে নাযিল হয়েছে এবং এই সবগুলো সূরাই মাক্কী যুগের প্রথম দিকে সূরা বলে আমরা জেনে থাকি।
এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। সূরার প্রথম যে আয়াত, সে আয়াত থেকে লাইলাতুল কদর শব্দটি থেকে আল কদর এই নামটি নেওয়া হয়েছে এবং এই নামেই এই সূরাটি সুপরিচিত।
এ সূরাটি নাযিলের যে সময়কাল বর্ণনা করা হয়েছে, সেই সময়ের ঘটনাকে বিভিন্নভাবে আমরা হাদিসে দেখতে পাই। যেমন একটা বর্ণনায় এসেছে যেখানে বলা হয়েছে যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামকে একবার বলা হয়েছিল যে একজন মুজাহিদের কথা যিনি হচ্ছেন যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধে সবসময় নিয়োজিত থাকতেন। বনী ইসরাইলের মধ্যে এমন একজন লোক ছিল যে হচ্ছে সর্ববস্থায় হচ্ছে যুদ্ধের সাজে সজ্জিত থাকতো এবং হাজার মাস হচ্ছে এই কাজেই তিনি নিয়োজিত থাকতেন। আমরা জানি যে যারা হচ্ছে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে তাদের কত সম্মান এবং হাজার মাস যখন কেউ আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে এবং সেই কাজে নিয়োজিত থাকে, তিনি আল্লাহ সুবহানা তায়ালার কাছে কাছে কত পছন্দনীয় হয়ে যান। সাহাবারা এ কথা শুনে খুবই অবাক হলো যে একজন মানুষ হাজার বছর বাঁচে এবং হাজার বছর ধরে আল্লাহর পথে যখন কাজ করে, তাদের তুলনায় আমরা কত ক্ষুদ্র এবং নগণ্য। সেই পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম আল্লাহর কাছে যখন চাইলেন, তখন আল্লাহ সুবহানা তাআলা তাকে লাইলাতুল কদর, কদরের রাত দান করলেন। যেই রাতকে বলা হয়েছে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। যেখানে ইবাদত করে মানুষ আমরা যারা হচ্ছি অল্প বয়স, অল্প জীবনকাল নিয়ে এসেছি। এই দুনিয়াতে তাদের জন্য আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম উম্মতে মুহাম্মদী হিসেবে আমাদের জন্য একটা স্পেশাল নিয়ামত নিয়ে আসলেন আল্লাহ সুবহানা তাআলার কাছ থেকে।
আরেকটা ঘটনা বর্ণনা এসেছে এরকমভাবে যে একজন বনী ইসরাইলের একজন ইবাদতকারী ছিলেন যিনি হচ্ছেন দিন রাত সারাক্ষণই হচ্ছে আল্লাহ সুবহানা তাআলার ইবাদত, রাতের বেলা সারারাত হচ্ছে আল্লাহ সুবহানা তাআলার ইবাদত করতেন এবং সকাল থেকে তিনি হচ্ছে আল্লাহর পথে যুদ্ধে নিয়ে যেতে থাকতেন। তার মানে হচ্ছে তার প্রতিটা মুহূর্ত আল্লাহ সন্তুষ্টির জন্য কাটাতেন এবং এভাবে তিনি হাজার মাস কাটিয়েছেন এবং এই পরিপ্রেক্ষিত এই সূরাটি নাযিল হতে পারে বলে বলা হয়েছে।
এই সূরার মূল বিষয়বস্তু এই নাম থেকেই আমরা বুঝতে পারি যে এই সূরার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে একটা বিশেষ সম্মানিত রাতকে নিয়ে এই সূরাটা নাযিল হয়েছে। এবং এখানে আমরা দেখি যে এই সূরার আগে যে সূরাটি অবস্থিত কোরআন মাজিদের ক্রমাণ্যয় অনুযায়ী সেটি হচ্ছে সূরা আল আলাক। সূরা আল আলাকের সাথে এই সূরার বিশেষ একটা সম্পর্ক রয়েছে। সূরা আল আলাক আমরা জানি যে প্রথম নাযিলকৃত আয়াতগুলো হচ্ছে সূরা আলাকে রয়েছে। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম হীরা গুহাতে ধ্যানমগ্ন ছিলেন তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের কাছে জিবরীল আলাইহিস সাল্লাম যেই নবুয়ত নিয়ে আসেন, যেই কথাগুলো নিয়ে আসা শুরু করেন, সেই শুরুটাই হচ্ছে সূরা আল আলাক।
এবং এই আমরা যখন লাইলাতুল কাদর নিয়ে পড়বো তখন দেখব যে আল্লাহ সুবহানা তায়ালা বলেছেন যে সেই রাতটা হচ্ছে মহিমান্বিত। কারণ এই রাতে হচ্ছে কোরআন নাযিল হয়েছে। অর্থাৎ সূরা আল আলাকে যেই ঘটনার বর্ণনা করা শুরু হয়েছে, লাইলাতুল কদর হচ্ছে সেই রাতের সূচনা। সেই রাতেই হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহ সাল্লামের কাছে এই কোরআনকে নিয়ে আসা হয়েছে। স এখানে আমরা দেখি যে সূরা আল আলাকে বলা হয়েছে কিভাবে নবুয়তে শুরু হয়েছে। আর সূরা আল কদরে বলা হচ্ছে কখন এটা শুরু হয়েছে। তেমনিভাবে সূরা আল আলাকে আমরা দেখতে পাই যে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা সেখানে আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে তোমরা সেজদা করো এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাতায়ালার নৈকট্য লাভ করো। সূরা আল কাদরে আল্লাহ সুবহানা তায়ালা আমাদেরকে বলে দিয়েছেন যে এই রাতটা হচ্ছে সেই স্পেশাল রাত যে রাতে ইবাদতের মাধ্যমে তোমরা আল্লাহ সুবহানাতায়ালা সবচেয়ে বেশি নৈকট্য অর্জন করতে পারো। সো এই সূরা আল আলেকে আল্লাহ সুবহানা তায়ালা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামকে যে শিক্ষা দিয়েছেন যেটা তিনি জানতেন না, সে শিক্ষা শুরু হয়েছে এই কদরের রাতে এবং সেই শিক্ষায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহ সাল্লাম তার বাকি জীবন ধারণ করেছেন এবং সেটা দিয়ে এই ধরনের বুককে আলোকিত করেছেন এবং সেই ঘটনার সূচনা হয়েছে লাইলাতুল কদরে।
সূরা আল কদর যদিও পাঁচটি আয়াতের একটি সূরা, কিন্তু এর মধ্যেও আমরা দেখি যে কোরআন মাজিদের একটা অনুপম বৈশিষ্ট্য যেটাকে রিং স্ট্রাকচার বলা হয়ে থাকে যে ঘুরে ঘুরে আমরা দেখি যে এর প্রত্যেকটা সূরার মধ্যে তার বিষয়বস্তুর মধ্যে একটা সুন্দর সমন্বয় রয়েছে। সূরা আল কদরের মধ্যে আমরা দেখি যে আল্লাহ এক নাম্বার আয়াতে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা বলছেন যে এই কোরআনকে তিনি নাযিল করেছেন লাইলাতুল কদরে। সো এখানে কখন কোরআন নাযিল হয়েছে সেই কথাটা আল্লাহ সুবহানা তায়ালা বলছেন এবং একদম শেষ আয়াত যেটা পাঁচ নাম্বার আয়াত, সেখানে আল্লাহ সুবহানা তায়ালা বলছেন যে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা সালাম অথবা শান্তি প্রেরণ করেছেন আমাদের জন্য। দুইটা আয়াতেই দেখি যে আল্লাহ সুবহানা তায়ালা কিছু জিনিস তার পক্ষ থেকে আমাদেরকে দিচ্ছেন। প্রথম আয়াতে হচ্ছে কোরআন আর যারা এই কোরআনকে অনুসরণ করবে তাদের জন্য রয়েছে শান্তি। তো আমরা এক এবং পাঁচ নাম্বার আয়াতের মধ্যে সুন্দর একটা সমন্বয় দেখতে পাচ্ছি।
আবার দুই নাম্বার আয়াতে আল্লাহ সুবহানা তায়ালা বলছেন যে তোমরা কি জানো যে লাইলাতুল কদর কি? তোমরা কি এটার মাহাত্ব বুঝতে পারছো? তোমরা কি এটা মাহাত্ব অনুভব করো? এবং চার নাম্বার আয়াতে আল্লাহ সুবহানাতালা বলছেন যে সেদিন হচ্ছে ফেরেশতারা ঝাকে ঝাঁকে নেমে আসবে। যারা হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত করছে তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করার জন্য। এখানে আমরা দেখি যে লাইলাতুল কদরের যে মহিমা সেটা উপলব্ধি করা যেমন আমাদের জন্য অনেক কঠিন একটা ব্যাপার। কারণ হচ্ছে এর গুরুত্ব এত অপরিসীম যে আমরা হয়তোবা সেটা সঠিকভাবে রিয়েলাইজও করতে পারি না অনেক সময়। তেমনিভাবে সেই শান্তি বা সেই অপরিসীম গুরুত্বের একটা অংশ হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা ফেরেশতাকুল যারা হচ্ছে সেদিন আসছে যেটা আমরা নিজের চোখে দেখতে পারছি না, যেটা শুধুমাত্র অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়।
এবং ঠিক মাঝখানে তিন নাম্বার আয়াতে আল্লাহ সুবহানা তায়ালা আমাদেরকে লাইলাতুল কদর অর্থাৎ এই সূরার মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে সুন্দরভাবে ভাবে বলে দিচ্ছেন যে এটা হচ্ছে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম একটি রাত। সুবহানাল্লাহ। এমনিভাবেই আল্লাহ সুবহানা তাআলার যেই বিরাটত্ব বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাই যে কোরআন মাজিদ আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের নিজের কথা না। তিনি নিজে এটা বানান নাই। কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব না। কোন কথা এত সুন্দরভাবে গুছিয়ে বলা যেখানে আমরা প্রথম শেষ মাঝখানে পুরোটা জিনিসের মধ্যে এত সুন্দর সমন্বয় সাধন করতে দেখি। তো এটাই হচ্ছে কোরআনের মোজেজা যে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। এটা কোন মানুষের বানানো হতে পারে না।
সো এই সূরা আল কদরে আল্লাহ সুবহানা তায়ালা শুরুই করেছেন যে লাইলাতুল কদরের গুনাগুল লাইলাতুল কদর যে একটা ব্লেসেড নাইট সে মহিমান্বিত রাত সেটা বর্ণনা করে এবং সেই রাতের গুরুত্ব কি? এটাই হচ্ছে এই সূরার মূল বিষয়বস্তু। এখন আমরা আয়াত ভিত্তিক ইনশাআল্লাহ জানার চেষ্টা করবো আল্লাহ সুবহানা তায়ালা আমাদেরকে লাইলাতুল কাদর সম্পর্কে কি জানাচ্ছেন।