📱

Get Our Mobile App

Take your business learning on the go!

Download on the App StoreGet it on Google Play

Sunday Suspense Classics | Ashareeri | Bibhutibhusan Bandyopadhyay | Mirchi Bangla

Mirchi Bangla25:45

Transcription

মিরচি সানডে সাসপেন্স গান টান [মিউজিক] উত্তেজনা

শরদ বাবু, আমি একটা কথা বলি? বলুন। আপনি এখান থেকে চলে যান। জিজ্ঞেস করলাম, কেন? বলুন তো। ডাক্তার বাবু তাই মত আমাকে তো কিছু বলেননি। দারকা বাবু ইতস্তত করে বললেন, আপনাকে বলেননি, আমাদের বলেছেন। আপনাকে বলবার জন্য তাই বলা উচিত ভাবলাম। উনি বলেছেন আপনার অসুখ খুব খারাপ। মানে আমি তো সেরে গিয়েছি? ও সারা বড় কঠিন, শরদ বাবু। বেশ। তাহলে স্টেশন পর্যন্ত আমি যাব কি করে? রক্ষিয়া ঘাট পার হবার তো কোন উপায় দেখি না। দারগো বাবু বললেন, আর কিছু ভাববেন না। স্ট্রেচার জোগাড় করছি চাবাগান থেকে। কুলি পাঠাবো। পুলিশের একজন লোক সাথী থাকবে। আপনাকে ট্রেনে উঠিয়ে না দিয়ে তারা ফিরবে না। আমি বললাম, বেশ। আমি তখন জানতাম না যে আজই আমার জীবনের শেষ দিন হতো। যদি [মিউজিক] সানডে সাসপেন্স ক্লাসি আজ শুনবেন বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা অশরীরী অশরীরী গল্পটি সানডে সাসপেন্সে প্রথম প্রচারিত হয় 26শে অক্টোবর 2014 সালে। শুরু হচ্ছে অশরীরী [মিউজিক]

নানা রকম অদ্ভুত গল্প হচ্ছিল সেদিন আমাদের লিচুতলার আড্ডায়। কিন্তু সেসব নিতান্ত পানসে গোছের ভূতের গল্প। পাড়াগায়ের বাঁশবাগানের আমবাগানের গেও ভূত। সাদা কাপড় পড়ে রাত্রে দাঁড়িয়ে থাকে। ওসব অনেক শোনা আছে। ওর বেশি আর কেউ কিছু বলতে পারলো না। এমন সময় শরদ চক্রবর্তী আড্ডায় ঢুকলেন। তিনি আবগারী বিভাগে বহুদিন কাজ করে অবসর গ্রহণ করেছেন। 60 এর কাছাকাছি বয়স। তান্ত্রিক সাধনা করেন, ঠিকুঝি কুষ্টি বিনা পয়সায় করে দেন, কোন রত্নের আংটি ধারণ করলে কার সুবিধে হবে ঠিক করে দেন, পরের বেগার খাটতে ওর জুড়ি বড় একটা দেখা যাবে না। এসব কাজে লোক অতি সজ্জন, সকলে মানে শ্রদ্ধা করে, অনেকে ওর সামনে ধুমপান করে না। শরদ বাবু ঢুকে বললেন, এই যে কি হচ্ছে? আজ যা বাদলা নেমেছে। শ্যামাপদ মুক্তার বললেন, আসুন আসুন চক্ষতি মশাই। আরে আমাদের ভূতের গল্প হচ্ছে বাদলার দিনে, তবে তেমন জমছে না। আপনার তো? শরদ চক্রবর্তী মশাই বললেন, আমি একটা গল্প বলতে পারি, তবে সেটা ভূতের গল্প নয়। সেটা কিসের গল্প তা আমিও জানিনা, আপনারা শুনে বিচার করুন। শরদ বাবুর মুখে সেই গল্প শুনে আমরা অবাক হয়ে গেলাম। স্বর্গমর্ত যেন এক সূত্রে গাঁথা হয়ে গেল সেই ঘন বর্ষার বর্ষণ মুখর মেঘের আবরণ ভেদ করে।

শরদবাবু বললেন, আমাকে সেবার হঠাৎ জলপাইগুড়ির ওধারে ডুয়ারস অঞ্চলে বদলি করল। আমার পরিবার বর্গ তখন ঢাকায়। তাদের ওখানে রেখে জলপাইগুড়ি চলে গেলাম। নতুন জায়গা। সেখানে নিজে না দেখে শুনে কি করে সবাইকে নিয়ে যায়। বিশেষ করে ছেলেমেয়েরা তখন ঢাকা স্কুলে পড়াশোনা করছে। তা যেখানে গেলাম সেখানটা জলপাইগুড়ি থেকে অনেক দূর। ছোট লাইনে যেতে হয়। পথে চাবাগান পড়ে। বনময় অঞ্চল। কিন্তু দূরে সবুজ বনরেখার পটভূমিকায় হিমালয়ের শিখরমালা চোখে পড়ে। বড় নির্জন স্থান। আমি যে জায়গায় গেলাম তার নাম হলদিয়া। ছোট্ট জায়গা। আমি সেখানে গিয়ে সিনিয়র সাব ইন্সপেক্টরের বাসায় উঠলাম। কারণ আমার বাসা তখনো ঠিক হয়নি। সে ভদ্রলোকের নাম রেবতি মোহন মুকুজে। বাড়ি নদীয়া জেলা। বেশ ফর্সা। লম্বা দোহারা চেহারা। আমায় খুব যত্ন করলেন। দিন কয়েকের মধ্যেই বাসা ঠিক করে দেবেন। ভর্সাও দিলেন। তৃতীয় দিন সকালে আমায় বললেন, আপনাকে একটা কথা বলি। আমি বললাম, কি? আপনার এখন এখানে আসা খুব ভুল হয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? তাতে বলে, আপনি জানেন না কিছু এদেশের ব্যাপারে। আমি বললাম, না কি ব্যাপার? বলে, এই বর্ষাকালে এখানে ভয়ানক ব্ল্যাক ওয়াটার জ্বর হচ্ছে চারিধারে। আপনি নতুন লোক। আপনার তো খুবই জ্বর হওয়ার সম্ভাবনা দেখছি। দু একবার জ্বর হলেই ওই ব্ল্যাক ওয়াটার জ্বর দেখা দেবে। তখন জীবন নিয়ে টানাটানি। এইরকম তো এ দেশের কান্ড। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা আছেন কি করে? তাতে উনি বললেন, সে কথা আর বলে লাভ নেই। ইচ্ছে করে নেই। আছি পড়ে পেটের দায়ে। চাকরি ছেড়ে দিলে এ বয়সে যাবো কোথায়? খাবো কি? আমার দুটি মেয়ে পরপর মারা গেছে ওই ব্ল্যাক ওয়াটার ফিভারে। তবুও বদলি পেলাম না। কি করি বলুন তো শরদ বাবু। তবেই তো। উনি আরো বললেন, একটু সাবধানে থাকলেই হবে। জলটা গরম না করে খাবেন না বাইরে গিয়ে। ব্ল্যাক ওয়াটার ফিভার হলেই কি মানুষ মারা যায়? আমার কৌতুহল ছিল। আমি জিজ্ঞেসও করলাম। তাতে উনি বললেন, ভালো চিকিৎসা না হলে বাঁচার সম্ভাবনা খুব কম। বিশেষ করে এই বর্ষাকালে যারা নতুন আসেন তাদের ধরলে বাঁচানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। আমি এরকম দুটো কেস দেখেছি। দুটোই মারা গেল। তা শুনে মনে একটু ভয় হলো। কিন্তু সাবধান হই বা কি করব? বিদেশে বেরিয়ে কতদূর সাবধান হওয়াই বা চলে। আর যা থাকে কপালে ভেবে কাজ আরম্ভ করে দিলাম। 10 12 মাইল দূরে দূরে ওই গাঁজার দোকান মদের দোকান তদারো করে বেড়াতে লাগলাম। ভালোই লাগছিল। বর্ষার সবুজ অভিযান শুরু হয়েছে বনে বনে। কত রকমের ফুল ফোটে। আর কত ধরনের পাখি ডাকলেন। দূরে হিমালয়ের বরফ ঢাকা কি একটা শৃঙ্গ একদিন দেখা গেল। মিচরির পাহাড়ের মত ঝকঝক করছে সকালের রোদ দূরে। তবে রোদ বড় একটা উঠতে ইদানিং আর দেখা যেত না।

ইতিমধ্যে রেবতী বাবুর চেষ্টায় ভালো একটা বাসা পাওয়া গেল। উঁচু কাঠের খুঁটির উপর কাঠের তক্তা বসিয়ে তার উপর বাংলো ধরনের ঘর করা হয়েছে। কাঠের মেঝে বেশ শুকনো খটখটে। ঘরটা বেশ বড়। আলো হাওয়া বেশ আসে। মনের ভয় আস্তে আস্তে কেটে গেল। তখন মনে মনে ভাবি, রেবতি বাবুর ওটা উচিত হয় না। এখানকার মাটিতে পা দিতে না দিতেই অমন ভয় দেখিয়ে দেওয়া কি ভালো? আরে কেন করলেন ওটা? রেবতি বাবু। অন্য কোন মতলব ছিল নাকি? এ নিয়ে সাত পাঁচ ভাবি। এখানে আমার এক ব্রাহ্মণ আরদালি জুটলো। নাম দিগম্বর পান্ডে। লোকটা অনেকদিন সেখানে আছে। রান্না করতো খুব ভালো। সে হাট বাজার রান্নাবান্না সবই করতো। কোন অসুবিধা ছিল না। মাস দুই পরে সেবার বামনাপাড়া নর্থ বলে একটা জায়গায় আবগাড়ির তদারুকে গেলাম। আর সেটা একটা চাবাগানের পাশে ছোট্ট বাজার। চাবাগানটার ট্রাকগুলোর পায়ে লেখা আছে, বামনাপড়া নর্থ ডি স্টেট। পাহাড়ি একটা ছোট নদী পেরিয়ে আমার গরুর গাড়ি বাজারে গিয়ে থামলো। তখন বাজে ওই বেলা 10টা। দুটি মারওয়াড়ি মহাজনের গদি আছে। তারা বন অঞ্চলের উৎপন্ন সওদা করে। দেবেন সামন্ত বলে মেদিনীপুরের একজন ব্যবসায়ীর কাঠের কারবার আছে। গাঁজা ও আফিমের দোকান। সেই দেবেন সামন্তের ভাই শশি সামন্তের। ওখানে বসে থাকতে থাকতেই আমার শরীর কেমন খারাপ হতে লাগলো। মাথা ধরলো। তা দেবেন সামন্তকে বলতে সে কি একটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধ দিলে। বললে, এতেই নাকি সেরে যাবে। কোন ভয় নেই। আমি বললাম, আপনাদের এখানে ব্ল্যাক ওয়াটার হয়? উনি বললেন, খুব। জিজ্ঞেস করলাম, মানুষ মরে? তাতে উত্তর দিলেন, তা মন্দ মরে না। আপনারা ভয় পান না। আমরা অনেকদিন আছি। নতুন যারা আসেন তাদের ভয় একটু বেশি। সবাই দেখছি একই কথা বলে। গাঁজার হিসেব চেক করতে করতে আর যেন বসতে পারলাম না। তাড়াতাড়ি কাজ সেরে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ি। জলতেষ্টা পাওয়াতে বামনাপাড়া নর্থ চাবাগানের একটা গুমটি টিনের সেড থেকে জল চেয়ে খাই এক নেপালি দারোয়ানের কাছ থেকে। যখন বাসায় পৌঁছলাম তখন বেলা হয়ে গেছে। আমার তখন খুব জ্বর। পথেই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছে। খবর পেয়ে রেবতি বাবু ছুটে এলেন। ডাক্তার ডাকা হলো। ওষুধ আর ইনজেকশন চলল। তিনদিনের মধ্যে জ্বর ছেড়ে গেল। দিন 15 বেশ আছি। সবাই বলে, ঠান্ডা লেগে অমনটা হয়েছিল হঠাৎ। ও কিছু না। আমিও নিজেকে সেইভাবেই বোঝালুম। আবার বেশ কাজকর্ম করি। শরীরের কোন কষ্ট নেই।

একদিন হলদিয়া পুলিশ থানায় বসে থানায় দারগার সঙ্গে গল্প করছি। হঠাৎ হঠাৎ আবার জ্বর এলো। দারগা বাবু লোক দিয়ে আমায় বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। আরদালি দিগম্বর পাড়েকে বললাম, জল দাও। জল খেয়ে শুয়ে পড়লাম। তিনদিন ভীষণ জ্বরের ঘোরে কাটলো। রেবতি বাবু এবং থানার দারগা বাবু দুবেলায় আসতেন। কিভাবে আমার সাবু বারলি তৈরি করতে হবে আমার আরদালিকে শিখিয়ে দিয়ে যেতেন। তিনদিন পরে জ্বর কমে গেল। ক্রমে বেশ সেরে উঠলাম। কাজকর্ম আবার শুরু করে দিলাম। দিন 15 পরে চাবাগানের একটা আবগারি কেস দেখতে গিয়েছি। আবার হঠাৎ করে জ্বর এলো। এবার একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম। এখানকার জ্বর ভেলকিবাজির মতো আসে। আবার ভেলকিবাজির মত চলে যায়। সুতরাং প্রথম প্রথম জ্বর এলে আমার যেরকম ভয় হতো এখন গাস হওয়ার ধরুন সে ভয় একেবারেই নেই। আরদালীকে ডেকে বলে দিলাম, আগের মত পথ্য প্রস্তুত করে আমাকে যেন খাওয়ায়। এবার কিন্তু একটু অন্যরকম হলো। অত সহজে এবার আমি নিষ্কৃতি পেলাম না। দিন দুই পরে উৎকট ব্ল্যাক ওয়াটার জ্বরের সব লক্ষণগুলি আমার মধ্যে ফুটে বেরুলো। অতিরিক্ত রক্তপাতের দরুণ অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়লাম। সেরে উঠতে পাঁচ ছ দিন লেগে গেল। দিন দুই পথ করার পর একদিন সকালবেলা আমার সঙ্গে রেবতি বাবু আর দারগা বাবুর দেখা করতে এলেন। আরদালীকে চা করে দিতে বললাম। কিন্তু তারা চা খেলেন না। পরে বুঝেছিলাম তারা চা খাননি। ব্ল্যাক ওয়াটারকে ছোয়াচে জ্বর ভেবেই দারগা বাবু বললেন, সদবাবু আমি একটা কথা বলি? বলুন। আপনি এখান থেকে চলে যান। জিজ্ঞেস করলাম, কেন? বলুন তো। ডাক্তার বাবু তাই মত আমাকে তো কিছু বলেননি। দারকা বাবু ইতস্তত করে বললেন, তা আপনাকে বলেননি, আমাদের বলেছেন। আপনাকে বলবার জন্য তাই বলা উচিত ভাবলাম। উনি বলেছেন আপনার অসুখ খুব খারাপ। মানে আমি তো সেরে গিয়েছি? ওর সারা বড় কঠিন, শরদবাবু। বেশ। তাহলে স্টেশন পর্যন্ত আমি যাব কি করে? রক্ষিয়া ঘাট পার হবার তো কোন উপায় দেখি না। দারগো বাবু বললেন, আর কিছু ভাববেন না। স্ট্রেচার জোগাড় করছি চাবাগান থেকে। কুলি পাঠাবো। পুলিশের একজন লোক সাথী থাকবে। আপনাকে ট্রেনে উঠিয়ে না দিয়ে তারা ফিরবে না। আমি বললাম, বেশ। আমি তখন জানতাম না যে আজই আমার জীবনের শেষ দিন হতো। যদি কিন্তু সে কথা পরে বলছি। আমি সম্মতি দিলে দারগা বাবু চলে গেলেন। তখন বেলা নটা হবে। গরম জল করে নিয়ে আসতে বললাম আরদালিকে। গা হাত মুছবো বলে। তারপর এক বাটি বারলি খেলাম। আরো একটু বেলা হলে দুটি ভাতও খেলাম। বেলা বটার পর লোকজন এলো স্ট্রেচার নিয়ে।

এই পর্যন্ত বলে শরদ চক্রবর্তী বললেন, একটু চা খাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে। আমরা বললাম, গল্পটা শেষ করুন। চা খেয়ে নিয়ে বলবো। এবার গল্পের আসল অংশটাতে এসে গিয়েছি কিনা? একটু গলা ভিজিয়ে নিয়ে বলি। উকিল নিতাই বাবু বললেন, একটা কথা আপনি বললেন ব্ল্যাক ওয়াটার জ্বর হলো, সেরে গিয়ে আপনি পথ্য করলেন, অথচ ডাক্তার বাবু কেন আপনার অসুখ খারাপ বললেন? অসুখ তো সেরে গিয়েছিল? সেরে গিয়েছিল? কিরকম? এক্ষুনি সেটা শুনলে বুঝতে পারবেন, আসলে সারে নেই। তবে পথ্য দিয়েছিল কেন ডাক্তার? এ কথার জবাব আমি দিতে পারবো না। কাউকে জিজ্ঞেসও করিনি। তবে যেমন ঘটেছিল সেই রকম বলে যাচ্ছি। এটা একটা অদ্ভুত কথা বলছেন আপনি। কিরকম? সে দেশের ডাক্তার বুঝলাম না মশাই। এই কথাটা আমি কখনো ভেবে দেখিনি। আচ্ছা এবার বলি গল্পটা। শরদ চক্রবর্তী আবার গল্প আরম্ভ করলেন। বেলা 12:00 টার পর স্ট্রেচার নিয়ে এলো চাবাগানের লোকজন। সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন রেবতি বাবু ও দারগা বাবু। আমি আর আরদালি জিনিসপত্র গোছাচ্ছি। এমন সময় এলো জ্বর। ভীষণ কাঁপনি দিয়ে জ্বর। আর আমি বসতে পারলাম না। ঘরের মধ্যে গিয়ে তাড়াতাড়ি বাঁধা বিছানা আরদালিকে দিয়ে খুলিয়ে পাতিয়ে শুয়ে পড়লাম। এবার আমি আর কিছুই জানি না। আমার সমস্ত চেতনা লুপ্ত হয়ে গেল এক ঘন অন্ধকারের আবরণের অন্তরালে। যখন আবার আমার জ্ঞান হলো তখন দুটো জিনিস আমার চোখে পড়লো। প্রথমেই অন্ধকারের মধ্যে একটা কি গাছের ডাল পাশের জানলার বাইরে হাওয়ায় দুলছে। আর দ্বিতীয় জিনিস হলো আমার বাক্স ও পুটুলি আমার পায়ের দিকের দেওয়ালের কাছে রয়েছে এবং আমার ছাতাটা দেওয়ালের কোণে হেলানো রয়েছে। আমি কি রেলওয়ে ট্রেনে উঠেছি? এত অন্ধকার কেন রেলের কামড়া? অন্য লোকই বা নেই কেন? তারপর আস্তে আস্তে আমার মনের আকাশ মেঘমুক্ত হয়ে আসতে লাগলো। আমার মনে পড়লো যে আমি স্ট্রেচারে আদৌ উঠিনি। জ্বর আসতে ঘরে এসে শুয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ঘরই যদি হয় আরদালী দিগম্বর কই? ঘরে আলো জ্বালেনি। আমি কোথায়? দেশটা পেয়েছিল। ডাকতে গেলাম ওকে। গলায় স্বর আটকে গেল। দুবার ডাকতে গেলাম। আর দুবারই তাই হলো। আমার মনে হলো বাইরে চাঁদ উঠেছে। জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে চাঁদের সামান্য আলো এসে পড়েছে। কিছুক্ষণ সামনের দিকে চেয়ে রইলাম। ঘরের মধ্যে বা বাইরে কোথাও কোন শব্দও নেই। হঠাৎ আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো বাইরের দিকে। কে ওখানে বাইরে? এই দেখুন, এতদিন পরে মনে পড়েও আমার গা শিউড়ে উঠলো। দেখলাম কি জানেন? একটি কালো মতন মেয়ে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে আমার ঘরের চারপাশে ঘুরছে আর একটা কাঠি দিয়ে মাটিতে কি যেন করছে। দুবার আমার সামনের দরজার ফাঁক দিয়ে সে নিচু হয়ে ঘুরে গেল। তিনবারের বার মেয়েটি হঠাৎ মুখ উঁচু করে আমার দিকে চেয়ে হাত নেড়ে বলল, কোন ভয় নেই তোর। গন্ডি দিচ্ছি। আজ রাতে এই গন্ডির মধ্যে কেউ আসতে পারবে না। ঘুমো। তুই ঘুমো। অতি অল্প সময়ের জন্য মেয়েটিকে চোখের সামনে দেখলাম। তারপর সে ঘুরে গেল ওদিকে। আমারও আর জ্ঞান রইলো না। ঘুমিয়ে পড়লাম কি? এরপরে কতক্ষণ পর জেগে উঠেছিলাম তা বলতে পারবো না। কিন্তু তখন চোখ খুলেই দেখলাম সেই কালো মেয়েটি আমার শিরের কাছে বসে। তার বয়স 18 বছরের বেশি হবে বলে আমার মনে হলো না। আর একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম। মেয়েটি যেন খুব ঘেমেছে। ওর মুখ ঘামে ভিজে গিয়েছে যেন সারা শরীর দিয়ে যেন দরদর করে ঘাম ঝরছে। আমি ওর দিকে চেয়ে দেখতেই মেয়েটির চমৎকার শান্ত স্নেহময় সুরে বলে উঠলো, জাগলি কেন? ঘুমো বলছি না? ঘুমো। কোন ভয় নেই। ঘুমো বলছি। ঘুমো ঘুমো। শেষবার যখনও ঘুমো বলছে তখন আমি ঘুমিয়ে পড়লাম ওর কথা শুনতে শুনতে। ঘুমিয়ে পড়বার আগে সেই গাছের ডালটার দিকে নজর পড়লো জানালার বাইরে। তার গায়ে জোনাকি পড়েছে। এইখানেই আমার গল্প শেষ।

সকালে আমি যখন জেগে উঠলাম তখন আমার মনে হলো স্বাভাবিক সুস্থ অবস্থায় ঘুম থেকে আমি জেগে উঠেছি। আমার শরীরে কোন কষ্ট নেই। কিন্তু বড়ই দুর্বল। বিছানা ছেড়ে উঠতে পারলাম না। আস্তে আস্তে একটু বেলা হলো। তখন দেখি দিগম্বর পাড়ে আরদালী সন্তর্পণে পা টিপে এসে ঘরের মধ্যে উকি দিচ্ছে। আমি ডাকতেই যেন সে চমকে উঠলো। কোন উত্তর দিল না। আমি বললাম, রেবতি বাবুকে ডেকে নিয়ে এসো। থতমত খেয়ে সে যেন চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে অনেক লোক এলো আমায় দেখতে। তার মধ্যে রেবতি বাবুও ছিলেন। রেবতি বাবু বললেন, এই কেমন আছেন শরদ বাবু? ভালো। আমি কিছু খাবো। তখনই রেবতি বাবু বাইরে গিয়ে কাকে কি বললেন। খানিক পরে এক বাটি বারলি এলো আমার জন্য। বারলি খেয়ে শরীরে একটু বল পেলাম। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বললেন, জ্বর ছেড়ে গেছে। এর দিন দুই পরে আমি সম্পূর্ণ নিরোগ হয়ে উঠলাম। অর্থও করলাম। তখন আস্তে আস্তে শুনলাম সেই ভীষণ রাতে আমাকে মুমূর্ষু মনে করে সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল একা ফেলে। ডাক্তার বাবু বলেছিলেন, রাত কাটবে না। এমনকি নাকি সকালে আমার সৎকারের জন্য কে কে যাবে, কোথায় কাঠ পাওয়া যাবে এসব বন্দোবস্ত পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিল। সকালেই লোক পাঠিয়ে আমার পরিবার বর্গকে টেলিগ্রামে আমার মৃত্যু সংবাদ জানানোর জন্য থানা থেকে একজন কনস্টেবল পাঠাবেন, দারগা বাবু। তাও ঠিক করে রেখেছিলেন। অথচ সেই নির্বান্ধব পরিত্যক্ত অবস্থায় কে আমার মৃত্যু সজ্যার পাশে সারারাত বসেছিল? কে আমার ঘরের চারিধারে গন্ডি একে দিয়েছিল আমাকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে? সবাই পরিত্যাগ করলেও কে আমাকে সেই অসহায় অবস্থার মধ্যেও পাহারা দিয়েছিল? এসব প্রশ্নের কোন জবাবই আমি দিতে পারবো না। যদি আপনারা বলেন সবটাই জ্বরের ঘোরে স্বপ্ন দেখেছি, তারও কোন প্রতিবাদ আমি করতে চাই না। স্বপ্ন যদি হয়, বড় মধুর, বড় উন্নত ধরনের, উদার স্বপ্ন দেখেছিল আমার মুমুর সুমন। সেই স্বপ্নের ঘোর আমার সারা জীবন চোখে রইলো মাখা। মস্ত বড় একটা আশার বাণী দিয়ে গেল [মিউজিক] প্রাণে। শরদ চক্রবর্তী চুপ করলেন। মনে হলো তার চোখে যেন জল চকচক করছে।

উকিল নিতাই পদ রাহা বললে, সেরে উঠে হলদিয়াতে আপনি ছিলেন কতদিন? যতদিন গভর্মেন্ট আমাকে বদলি না করেছিল। তাও প্রায় দু বছর হবে। এভাবে একা ছিলেন বাসায়? আমি আর দিগম্বর। আর কেউ না। আর কোনদিন কিছু দেখেছিলেন? না। আর অসুখে ভুগেছিলেন? না। ঘন বর্ষার রাত। বাইরে বেশ অন্ধকার। জোনাকি জ্বলছিল। উঠানের শিউলি গাছটার ডালে পাতায় আমরা সবাই অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম। নিতাই উকিলও আর বেশি কথা বলেননি। বৃষ্টি এসে পড়বে বলে শরদ চক্রবর্তীকে আমরা বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম ছাতা দিয়ে। সানডে সাসপেন্স ক্লাসিক্সে শুনলেন বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা অশরীরী গল্প। পাঠে মীর শব্দগ্রহণ, রিচার্ড ধ্বনি পরিকল্পনা ও আবহ সংগীতে আকাশ, প্রচার অলংকরণ গ্রিনিং ট্রি, পর্ব পরিচালনায় অনির্বাণ ও অভিষেক, সমগ্র পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ইন্দ্রানী। মিরচি সানডে সাসপেন্স গান ডান উত্তেজনা