Transcription
ঘন জঙ্গলের বুক চিড়ে এগিয়ে যাচ্ছিল এসটিএফ টিম, নিঃশব্দে, সাবধানে। হঠাৎ এক ঝোপের ভেতর, বুনো ঘাস আর লতাপাতা গুল্মে ঢাকা, দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত একটি জায়গায় তারা দেখতে পেল মাটির নিচে ঢুকে যাওয়া একটি ধাতব পাইপ। প্রথম দেখায় ব্যাপারটা ছিল অদ্ভুত, কিন্তু এরপরই সবই থমকে যায়, কারণ এটি ছিল ডেড ফ্যালকন এরিয়া। এক নিস্তব্ধ পরিত্যক্ত অঞ্চল, যেখানে গত কয়েক দশকে কেউ প্রবেশ করেনি।
তাই প্রশ্ন ওঠে, এই পাইপটি কিসের? আর এর ভেতরেই বাকি আছে। এসটিএফ টিম সিদ্ধান্ত নেয়, পাইপের গভীর অন্ধকারে পাঠানো হবে একটি নাইট ভিশন ক্যামেরা। এরপর ক্যামেরাটি ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করে। 10 মিটার, 20 মিটার, 30 মিটার গভীরতা অতিক্রম করবার পর পর্দায় ভেসে ওঠে এক বিশাল ধাতব সুরঙ্গ। এক অজানা রহস্যের দরজা, যা খুলতে চলেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হারিয়ে যাওয়া এক ইতিহাস।
তারিখ ছিল 7ই মার্চ 2018। পোল্যান্ডের ওয়াল ব্রিজ শহরের কাছেই। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালাচ্ছিল একটি এক্সপ্লোরেশন টিম। টিমের কাছে ছিল একটি পুরনো হাতে আঁকা মানচিত্র এবং কিছু সংকেত, যা কয়েক দশক ধরে এক গুপ্ত সংস্থার কাছে সংরক্ষিত ছিল। অত্যাধুনিক গ্রাউন্ড প্রিন্টিং রাডার, জিপিআর এবং সেন্সর ব্যবহার করে তারা ঘন জঙ্গল এবং পাহাড়ি ওই এলাকাটি স্ক্যান করছিল। স্থানীয় মানুষজন এই এলাকাটিকে ভুতুরে উপত্যকা বলে রাখত এবং রাতের বেলায় এখানে যেতে ভয় পেত।
টিমটি এমন একটি পরিত্যক্ত স্থানে পৌঁছালেন, যেখানে একটি ধাতব পাইপ গোপনে ভূগর্ভে প্রবেশ করছিল। তারা তখন বুঝতে পারেনি, ভূগর্ভের অন্ধকারে তারা যা দেখতে চলেছে, তা ইতিহাসের পাতায় অনন্য হয়ে থাকবে। সুরঙ্গের নিকশ কালো অন্ধকারে ক্যামেরার আলো ফেলতেই প্রথমে যা চোখে পড়ল, তা হলো মাটির বুক চিড়ে চলে যাওয়া একজোড়া ধাতব পাথ। পুরনো এক রেললাইন। সেই লাইন ধরে দৃষ্টি এগোতেই দেখা গেল, বহু বছর ধরে অচল, মরিচা পড়া একটি মাইনিং এর গাড়ি। 80 বছর ধরে এটি শুধু কিংবদন্তি বা গুজব হিসেবেই টিকেছিল। আজ ক্যামেরার চোখে তা বাস্তবে পরিণত হলো।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন একটি গোপন মানচিত্র প্রকাশ করে। মানচিত্র অনুযায়ী, এটি নাচসি বাহিনীর তৈরি এক গোপন স্টোরেজ, যা প্রায় 80 বছর আগে নির্মিত হয়। কাজ শেষে পাথর, মাটি ও গাছপালা দিয়ে এর প্রবেশপথ এমনভাবে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, যেন কেউ এর অস্তিত্ব খুঁজে না পায়। দৃশ্যটি একটি টাইম ক্যাপসুলের মতো, যা 80 বছর আগের শেষ কর্মদিবসের মুহূর্তটিকে অবিকল ধরে রেখেছে, যেন সিনেমার একটি দৃশ্য মাঝপথে পজ করে দেওয়া হয়েছে এবং অভিনেতারা আর ফিরে আসেনি। রেললাইন এখনো ছড়িয়ে আছে, মাইনিং এর গাড়ি থেমে আছে ঠিক আগের জায়গায়, আর চারিপাশে পড়ে আছে মরচে ধরা যন্ত্রপাতি, বেলচা, কোদাল, ড্রিল, যেন নাতসি সেনারা সেগুলোকে ব্যবহার বিশ্রামে গিয়েছিল, কিন্তু আর কোনদিন ফিরে আসেনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ইউরোপ তখন এক বিস্ফোরণ গর্ভমানচিত্র। ইতিহাসের প্রতিটি পাতা লেখা হচ্ছিল রক্ত দিয়ে। এই ভয়াবহ সংঘাতের গভীরে লুকিয়েছিল এমন এক অস্ত্র, যা দেখা যেত না, যা ছিল মাটির নিচে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবথেকে গোপন এবং মারাত্মক অধ্যায়, ভূগর্ভস্থ বাংকার। হিটলার জানতেন, আকাশপথে আক্রমণ আসবেই। আর সেই আক্রমণকে ফাঁকি দিতেই ইউরোপ জুড়ে তৈরি করা হয় হাজার হাজার আন্ডারগ্রাউন্ড ফর্টিফিকেশন। এর লক্ষ্য শুধু নিজের সেনাকে বাঁচানো ছিল না। লক্ষ্য ছিল মাটির নিচ থেকেই শত্রুকে ধ্বংস করা। কংক্রিট আর লোহার এই দুর্গগুলো ছিল প্রায় অভেদ্য। বোমারু বিমান, আর্টিলেরি বা গ্যাস অ্যাটাক, কিছুতেই এদের ধ্বংস করা যেত না। আর ভেতরে ভেতরে ছিল আরেকটি জগৎ। অস্ত্রাগার, মাসের পর মাস চলার মত রেশন, নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, এমনকি আস্ত একটা হাসপাতাল। এক একটা বাংকার যেন ছিল মাটির নিচের এক স্বয়ংসম্পূর্ণ শহর।
এর সবথেকে বড় উদাহরণ ছিল আটলান্টিক ওয়াল। ফ্রান্সের উপকূল জুড়ে জার্মানির বানানো সেই বিশাল প্রতিরক্ষা প্রাচীর। কিন্তু সব বাংকার শুধু প্রতিরক্ষার জন্য ছিল না। অনেক বাংকারই ছিল নাসিদের নার্ভ সেন্টার, এক একটা ওয়াররুম, যেখান থেকে যুদ্ধের প্রতিটি চাল, প্রতিটি নির্দেশ, শত্রুর মাথার উপর মৃত্যু হয়ে ছড়ে পড়তো। কামান্ডার, গোপন টানেল আর রেডিও ট্রান্সমিশন, সব মিলিয়ে এগুলো ছিল একেকটি নীরব যুদ্ধমঞ্চ। যুদ্ধ যত এগতে থাকে, মাটির নিচে এই সাম্রাজ্য তত বাড়তে থাকে। আজও ইউরোপের বুকে হাজার হাজার বাংকার নীরবে ঘুমিয়ে আছে। অনেকের অস্তিত্বই হয়তো ইতিহাস ভুলে গেছে।
এই বিশাল কাঠামো তৈরির জন্য যে পরিমাণ লোহা আর সিমেন্ট ব্যবহার হয়েছিল, তাতে বিশ্বজুড়ে কাঁচামালের সংকট দেখা গিয়েছিল। অনুমান অনুযায়ী, শুধুমাত্র এই বাংকার গুলোর নির্মাণের ব্যয়ে আজকের দামে পৌঁছাতে পারে 500 বিলিয়ন থেকে এক ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। তুলনায় আমেরিকার আফগানিস্তান যুদ্ধ, যা চলেছিল 20 বছর, তাতে প্রতিদিন খরচ হতো 300 মিলিয়ন ডলার। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, শুধুমাত্র বাংকার নির্মাণেই খরচ হয়েছিল প্রতিদিন প্রায় 460 মিলিয়ন ডলার। এটা ছিল কেবল নির্মাণ ব্যয়। মানব সম্পদ, অস্ত্র আর লজিস্টিকের খরচ ছিল আরো আকাশ ছোঁয়া। নাসিদের বিশ্বজয়ের যে বিশাল পরিকল্পনা, তার হৃদয় ছিল এমনি একটি বাংকার এবং একটি কংক্রিটের প্রাচীর।
3800 কিলোমিটার দীর্ঘ এক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা উত্তর ইউরোপের উপকূল জুড়ে ছড়িয়েছিল। হিটলারের নির্দেশে বানানো এই ওয়ালের লক্ষ্য ছিল একটাই। মিত্রশক্তির যেকোনো সামুদ্রিক হামলাকে গুড়িয়ে দেওয়া। এর প্রত্যেকটি অংশ ছিল ভয়ঙ্কর কৌশলগত। যেমন ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলে থাকা লঙ্গেস্ট সুরমেড ব্যাটারি, একটি আটলান্টিক ঘাটি, যার কংক্রিটের দেওয়াল আজও প্রায় অক্ষত। নরওয়ের উপকূল থেকে নেদারল্যান্ড পর্যন্ত হাজার হাজার বাংকার আর কামান বসানো হয়েছিল। এই বিশাল প্রতিরক্ষা বলয় পরিকল্পনা ও নির্মাণে নেতৃত্ব দেয় জার্মান ইঞ্জিনিয়ার ফ্রিটজ টডের কুখ্যাত কোম্পানি অর্গানাইজেশন টড। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় আড়াই লক্ষেরও বেশি শ্রমিক, যাদের অধিকাংশই ছিল যুদ্ধবন্দী, তাদের জোর করে এই প্রকল্পে কাজ করানো হয়। এই বাংকার, সুরঙ্গ আর আর্টিলারি ঘাটিগুলো ছিল এতটাই মজবুত যে আজও তাদের ধ্বংসাবশেষ দাঁড়িয়ে আছে, এক নিঃশব্দ প্রমাণ হয়ে।
কেমন ছিল নাসি ইঞ্জিনিয়ারিং ও হিটলারের তৈরি এই প্রতিরক্ষা প্রাচীর, কতটা শক্তিশালী? মিত্রশক্তির কাছে এটি ছিল এক মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। উত্তর খুঁজতে 1942 সালে কানাডিয়ান সেনারা ফ্রান্সের উপকূলে এক গোপন অভিযানের পরিকল্পনা নেয়। নাম অপারেশন ডাইপরেট। উদ্দেশ্য ছিল একটাই। এই কংক্রিট দানবকে কাছ থেকে বোঝা এবং এর শক্তি পরীক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম। কানাডিয়ান সৈন্যরা উপকূলে পা রাখার মুহূর্তেই তারা পড়ে যায় নাসিদের ভয়াবহ ক্রসফায়ারের মুখে। বুলেট, বোমা, শেল, প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু নেমে আসে। এই অভিযানে অংশ নিয়েছিল প্রায় 6000 সৈন্য। তাদের মধ্যে প্রায় 3600 জনই হয় নিহত বা বন্দি। এই ভয়াবহ ব্যর্থতা মিত্রশক্তির চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এই দেওয়াল ভাঙতে হলে কেবল সাহস নয়, চাই ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তিতে বিশাল পুনঃবিনিয়োগ।
হিটলার শুধু একনায়ক ছিলেন না। ছিলেন এক প্রতিরক্ষা দানবের স্তপতি। ডাইভ রেডের ব্যর্থতা থেকেই শুরু হয় নতুন পরিকল্পনা। মিত্রশক্তি বুঝে যায়, জার্মানির বিরুদ্ধে জয় পেতে হলে চাই নিজস্ব বাংকার, সুরঙ্গ আর অদৃশ্য ঘাটি। যুদ্ধ তখন শুধু অস্ট্রেল লড়াই ছিল না। এটা ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রতিরক্ষা কৌশলের এক বিপুল প্রতিযোগিতা। এরপর ব্রিটেন, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কানাডা, প্রতিরক্ষার নতুন মানচিত্র আঁকে মাটির নিচে। লন্ডনের চার্চিল ওয়াররুমস ছিল এই এমনই এক গোপন ঘাটি, যেখানে বসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল চালাতেন গোটা যুদ্ধের পরিকল্পনা। এটি এতটাই সুরক্ষিত ছিল যে নাচসিদের একের পর এক বিমান হামলা থেকে রক্ষা পায়। ফ্রান্সের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরি ম্যাজিনো লাইনকে আরো আধুনিক করে তোলা হয়। এইসব ঘাটির সবথেকে বড় অস্ত্র ছিল এদের অদৃশ্যতা। উপরে মাটি, ঘাস, জঙ্গল আর নিচে ছিল যুদ্ধের গোপন হেডকোয়ার্টার।
মিত্রশক্তি আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা এই জার্মান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভাঙ্গার জন্য বছরের পর বছর পরিকল্পনা করেছিল এবং এরপরই এল সেই ঐতিহাসিক সকাল 6ই জুন 1944। দিয়ে এই এক অভিযানে অংশ নিয়েছিল 1 লক্ষ 56 হাজার সৈন্য। ব্যবহার করা হয় 5000 জাহাজ এবং 11000 যুদ্ধ বিমান। হিটলারের পক্ষে তৈরি ছিল এক শক্তিশালী প্রতিরক্ষা, আর্মড বাংকার, আকাশপথে আর্টিলারি, সমুদ্রের কাটা তার। তবু মিত্রবাহিনীর বিপুল রসদ, নিখুত পরিকল্পনা আর অদম্য সাহস সবকিছুকে পেছনে ফেলে দেয়। আকাশ থেকে বৃষ্টির মত নেমে আসে প্যারাটুপার, শুরু হয় এয়ার স্ট্রাইক। নাসিদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, প্রতিরক্ষার পাথরে ফাটল ধরে। ডি ডেতে মিত্রবাহিনীকে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা জার্মানির ইউরোপ দখলের স্বপ্নকে চিরতরে মাটি চাপা দিয়ে দেয়। এটাই ছিল সেই অদৃশ্য যুদ্ধের দৃশ্যমান পরিণতি।
আজও আটলান্টিক ওয়ালের ভাঙ্গা কংক্রিট, মরচে ধরা স্টিল আর অন্ধকার সুরঙ্গগুলো দাঁড়িয়ে আছে, যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই ভয়াবহ অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী। একটি বাংকার যা যুগের পর যুগ ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরে আছে এবং একটি দিন যা পাল্টে দিয়েছিল গোটা বিশ্বের মানচিত্র।
আজকের ভিডিওটি এইটুকুই। আপনাদের ইতিহাস সম্বন্ধিত এই ভিডিওটি কেমন লাগলো অবশ্যই কমেন্ট করবেন। পাশাপাশি ভিডিওটিকে লাইক এবং শেয়ার করে অদ্ভুত 10 চ্যানেলটিকে আরো বড় হতে সাহায্য করবেন। আর যাদের কাছে নতুন ভিডিওর নোটিফিকেশন যাচ্ছে না, তারা অবশ্যই আনসাবস্ক্রাইব করে আবারো সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনে প্রেস করে নেবেন। সর্বশেষে থ্যাংকস ফর ওয়াচিং। সুস্থ থাকুন, আনন্দে থাকুন।
[মিউজিক]