Transcription
আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম। ইয়াসিন।
সূরা ইয়াসিনের প্রথম আয়াত, যেখানে আমরা দেখি আল্লাহ সুবহানাতায়ালা শুরু করেছেন হরফে মুকাদ্দাত দিয়ে। এই যে কতগুলো সূরা আছে আমরা দেখি কোরআনের মধ্যে যেখানে প্রথম দিকেই আল্লাহ সুবহানাতায়ালা শুধুমাত্র কিছু হরফ ব্যবহার করেছেন। কোথাও হয়তোবা একটি হরফ, কোথাও হচ্ছে একাধিক হরফ তিনি ব্যবহার করেছেন। শুধু এই হরফগুলো দিয়ে যখন একটা অংশ তৈরি হচ্ছে তখন সে হরফগুলোকে বলা হচ্ছে হুরুফাল মুকাত্তাত, যেগুলোকে বলা হচ্ছে সেপারেটেড লেটার। সো এখানে আমরা দেখি যে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা অন্যান্য কয়েক বেশকিছু সূরার মতোই সূরা ইয়াসিনকেও হচ্ছে এভাবে শুরু করেছেন।
তো আমাদের বরাবরই প্রশ্ন আসে যে কেন আল্লাহ এই হরফগুলো দিয়ে শুরু করেছেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মানবতার জন্য কেন এই হরফগুলো দরকার? সো এই হরফগুলো দিয়ে আসলে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদেরকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন আমরা যাতে কোরআনের যে ডিপ মিনিংস রয়েছে, আল্লাহ সুবহানাতায়ালার যে উইজডম রয়েছে সেগুলোর প্রতি আরো বেশি রিফ্লেক্ট করি, সেগুলোর প্রতি আরো বেশি মনোযোগ দেই। সো আমরা জানি যে কোরআন হচ্ছে একটা খনির মতো। আমরা যত বেশি এটাতে ডুব দিব, যত বেশি গভীরে যাব তত বেশি হচ্ছে এখান থেকে আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় যে জিনিসগুলো রয়েছে সেগুলো আরো বেশি করে পাবো এবং বুঝতে পারবো।
তো এখানে আমরা দেখি যে এই যে ইয়াসিন দিয়ে শুরু করা হয়েছে, সেই ইয়াসিন এই দুইটা লেটার দিয়ে কেন শুরু করা হলো। যেমন আমরা দেখি আলিফ লাম মিম, কোথাও আছে হচ্ছে কফ। এরকমভাবে বিভিন্ন সূরা শুরু করা হয়েছে। সো প্রথমত হচ্ছে আমাদেরকে এটা বুঝতে হবে যে এই শব্দ বর্ণগুলোর অর্থ কি? এ বর্ণগুলোর অর্থ শুধুমাত্র আল্লাহ সুবহানাতায়ালাই জানেন। এই ব্যাপারে আমাদেরকে গভীর বিশ্বাস রাখতে হবে। এবং এটাই হচ্ছে মোস্ট অথেন্টিক পজিশন, মেজরিটি পজিশন ওলামার মধ্যে যে অনলি আল্লাহ নোজ ট্রু মিনিং। আমরা মানুষ হচ্ছে এর বিভিন্ন তাফসীকারগণের বিভিন্ন ধরনের অর্থ বের করার চেষ্টা করেছেন, সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। আমরা চিন্তাভাবনা করতে পারি, কিন্তু মূল কথা যেটা থাকবে সেটা হচ্ছে যে আমরা আমরা জানি না এটার কি অর্থ। শুধুমাত্র আল্লাহ সুবহানাতায়ালাই এই অর্থগুলো জানেন।
এবং এটাই হচ্ছে কোরআনের যে মিরাকল, সে মিরাকলের একটি অংশ। যে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা যে আরবদের কাছে এই কোরআনকে নাযিল করেছেন, সেই সময়ে সেই সময় সে আরবরা ছিল মোস্ট পয়েটিক অ্যালোকেন্ট। তারা হচ্ছে তাদের যে এরাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ সেটার উপরে তারা মাস্টার ছিল, কিন্তু তারা কখনো আগে এরকমভাবে কোন কিছু ইউজ করতে দেখে নাই। সো এটা তাদের কাছে খুবই সারপ্রাইজিং একটা জিনিস ছিল যে কেন এই ধরনের লেটার দিয়ে শুরু করা হচ্ছে এবং তারা অবাক হয়ে সেটার দিকে সেটা নিয়ে চিন্তা করতো। সো এ কারণে বলা হয় যে এই লেটারগুলো দিয়ে শুরু করার একটা উদ্দেশ্য হতে পারে এটা, সেটা হচ্ছে যে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা যারা হচ্ছে লিসেনার অডিয়েন্স তাদের এটেনশন ড্র করছেন এবং আল্লাহ সুবহানাতায়ালা পরবর্তীতে যে কথাগুলো বলবেন সেই কথাগুলো হচ্ছে আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে।
সো এখানে একটা জিনিস লক্ষণীয় যেটা সেটা হচ্ছে যে যখন আমরা ইয়াসিন বা এ ধরনের লেটারগুলো পড়া শুরু করি এবং মানুষ যখন জ্ঞানের চরম শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছে তখনও তারা জানে না যে এই লেটারগুলোর অর্থ কি, তখন আসলে এটাই আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে যে আমরা আসলেই কিছু জানিনা। আমরা ততটুকুই জানি যতটুকু আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদেরকে জানিয়েছেন। এর বাইরে যেই বিশাল যে বিশ্ব ব্রহ্মান্ড রয়েছে, বিশাল যে জ্ঞানের ভান্ডার রয়েছে সে সম্পর্কে আমাদের কোন জ্ঞানই নেই। অথচ আমরা কত অহংকারী এবং গর্ববোধ অহংকারী হয়ে যাই এবং গর্ববোধ করি। সো এর মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে আসলে আমরা জ্ঞানের যত উপরের লেভেলে উঠি না কেন, আল্লাহ সুবহানাতায়ালার জ্ঞানের কাছে সেটা অত্যন্ত তুচ্ছ।
সো আল্লাহর জ্ঞানের কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং বিশ্বাস করা যে আল্লাহ সুবহানাতায়ালার জ্ঞান অসীম এবং তিনি আমাদেরকে যা জানাবেন সেটাই আমাদের জন্য অনেক বেশি উপকারী। সো কোরআনকে আমরা যখন পড়তে আসবো, এই আয়াতগুলো আমাদেরকে আহ্বান করে চিন্তা করতে যে কোরআন যখন পড়তে আসবা তখন তোমরা উন্মুক্ত মন নিয়ে পড়তে আসো। তুমি যদি অহংকারী হয়ে এই কোরআনের কাছে আসো তাহলে এই কোরআন থেকে তুমি কিছুই পাবে না। এবং সেই অহংকারের মূলেই হচ্ছে কুঠারাঘাত করা হচ্ছে এই লেটারগুলো দিয়ে যে তোমরা এরাবিক ল্যাঙ্গুয়েজে তোমরা শীর্ষে অবস্থান করো, যেটা নিয়ে তোমরা গর্ববোধ করো। অথচ এর অর্থ কিন্তু তোমরা জানো না। তার মানে হচ্ছে যে তোমরা জানার আগ্রহ নিয়ে এই কোরআনের কাছে আসো।
এবং যখন আমরা এরকম বিনয়ের সাথে কোরআনের কাছে আসবো, সেটা শুধু এরাবদের জন্য না, এটা যুগ যুগান্তর ধরে যখন আমরা বিনয়ের সাথে উন্মুক্ত হৃদয় নিয়ে কোরআনের কাছে আসবো, আমার পুরনো সব ধ্যান ধারণা সমস্ত কিছু দূর করে দিয়ে যে আল্লাহ সুবহানাতায়ালার অসীম জ্ঞানের কাছে আমি আত্মসমর্পণ করছি। তখনই আমরা এই কোরআন থেকে হেদায়েত লাভ করতে পারব।
তো যেটা আমরা দেখেছি যে তাফসীরকারকগণ বিভিন্ন সময়ে আসলে এর অর্থ চিন্তা করেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন। এগুলো সঠিক হতে পারে। এগুলো হচ্ছে আমাদের রিফ্লেকশনের ফলাফল। সঠিক অর্থ কি আমরা জানি না। আল্লাহ সুবহানাতায়ালা জানেন। তবে এগুলো সবই প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়ে থাকে। যেমন তাফসীকারগণের মতে যে ইয়াসিন এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা নাম হিসেবে এখানে আসতে পারে। যেমন ইয়া যেটা অর্থ সেটা হচ্ছে একটা মানুষকে ডাকা। ইয়া বলে মানুষকে ডাকা হয়। এটা হচ্ছে এই ডাকার জন্যই হচ্ছে ইয়া শব্দটা বলা হয়েছে। যেমন ও প্রফেট, হে নবী, এভাবে হয়তোবা ইয়া বলা হয়েছে। এবং সিন দিয়ে সিন শব্দটার সাথে ইনসান শব্দটার হচ্ছে কানেকশন করা হয়েছে। যেমন ইনসান হচ্ছে হিউম্যান, মানুষ বুঝানো হচ্ছে। সো এখানে সিন শব্দটা দিয়ে মানুষের কথা বুঝানো হচ্ছে এবং সেই মানুষদের মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই হচ্ছেন সেন্টার এবং এসেন্স অফ হিউম্যানিটি। সেজন্য এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা নিকনেম হিসেবে এই ইয়াসিনটা বলা হয়েছে। অনেকেই বলেন। এ ব্যাপারে আমরা দেখি যে গ্রেট তাবি সাঈদ ইবনে জুবায়ের এবং তিনি বলেছেন যে এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেকগুলো নামের মধ্যে একটা নাম। এবং ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহ আলাইহি বলেছেন যে ইয়াসিন আসলে আল্লাহ সুবহানাতায়ালার একটি নাম। স বিভিন্নভাবে এই ব্যাপারগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
যেমন ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহ আনহু তিনি বলেছেন যে ইয়াসিন মানে ও মানুষ, ও হে ব্যক্তি, এভাবে হচ্ছে ডাকা হচ্ছে এবং এখানে ইয়াসিন বলতে হে সাইদ বলা হতে পারে এবং সাঈদ বলতে হচ্ছে লিডার, সাঈদ মানে হচ্ছে নেতা। সো এখানে ইয়া সাঈদ বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এখানে বুঝানো হতে পারে। সো এখানে আমরা দেখি যে বিভিন্ন অর্থ হতে পারে, সব অর্থই কারেক্ট হতে কিন্তু সবসময় আমাদেরকে যে বিশ্বাসটা রাখতে হবে যে মূল অর্থ কোনটা সেটা আল্লাহ সুবহানাতায়ালাই ভালো জানেন।
তো এখানে আমরা দেখি যে ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহ মতে এটা হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাতায়ালার নাম, একটা নাম হতে পারে ইয়াসিন। এখানে ইবনুল আরাবি বলেছেন ইমাম মালিকের রেফারেন্সে যেটা আল্লাহ সুবহানাতায়ালার একটা নাম ইয়াসিন।
এরপরে আমরা দেখি যে এই হরফুল মুকাত্তাত যখন থাকে তারপরেই ইন্টারেস্টিং একটা জিনিস যেটা সেটা হচ্ছে যে পরপরই যে কথাগুলো বলা হয় সেটা হচ্ছে কোরআন সম্পর্কিত। পরবর্তী আয়াত হতে পারে বা পরের অংশ হতে পারে সেখানে বলা হচ্ছে কোরআনের কথা। এর মধ্যে একটা এক্সেপশন শুধু সূরা রুম। এছাড়া প্রত্যেকটা আয়াতেই আমরা দেখি যে যেখানে এখানে যখনই এ ধরনের হরফ দিয়ে শুরু করা হয় তখনই হচ্ছে কোরআনের কথা বলা হয়েছে।
সো তাফসীর ইবনে কাসীরে বলা হয়েছে যে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা এই হরফগুলোকে ব্যবহার করেন সূরা ওপেন করার জন্য এবং এই হরফগুলোর ব্যাপারে তিনি বলেছেন যে এই হরফগুলো ব্যবহার করা হয় মানুষের এটেনশন করার জন্য এবং এর পরবর্তীতে এই সূরাতে যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে সেগুলোর উপরে মানুষ যাতে গুরুত্ব দেয়।
তো আমরা দেখি যে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা কোরআনে বারবার হচ্ছে মানুষকে আহ্বান করেছেন। তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন যে তুমি যদি বলো যে এই কোরআন হচ্ছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের হাতে বানানো তাহলে এর মত একটা কোরআন তোমরা তৈরি করে দেখাও। একটা সূরা তৈরি করে দেখাও। একটা আয়াত তৈরি করে দেখাও। সো যারা হচ্ছে তখন তাদের এরাবিক ল্যাঙ্গুয়েজের শীর্ষে অবস্থান করছিল তাদের সামনে যখন এই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হলো তারা সে চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে পারেনি। কখনোই দিতে পারবে না এবং এটাই হচ্ছে কোরআনের একটা মিরাকুলাস ন্যাচার এবং এই লেটারগুলো দিয়ে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা কোরআনে সে মিরাকলকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন।
এবং কোরআন এর পরের আয়াতগুলোই হচ্ছে কোরআন সম্পর্কিত থাকে এবং কোরআনকে বলা হয় রুহ, অর্থাৎ কোরআন আমাদেরকে জীবন দান করে, আমাদের এই অন্ধ মৃত হৃদয়টাকে জাগিয়ে তোলার জন্যই হচ্ছে কোরআন এবং সেই কোরআনের দিকে আহ্বান করা হয় এই লেটারগুলো দিয়ে। এবং যদি তোমরা জানতে চাও, এখন তোমরা জানো যে এই লেটারগুলো জাস্ট তোমাদের সামনে হরফগুলো তুলে ধরা হয়েছে, তোমরা এটার অর্থ ব্যাখ্যা জানতে পারো না, বুঝতে পারছো না। যদি তোমরা জানতে চাও আল্লাহ সুবহানাতায়ালার অসীম জ্ঞান সম্পর্কে এবং তার নির্দেশ নির্দেশনা সম্পর্কে তাহলে তোমরা কোরআনকে খুলে পড়ো। কোরআনকে বুঝার চেষ্টা করো। এটা যেন মানুষকে আহ্বান করা হচ্ছে। তুমি যদি জানতে চাও, তুমি তো জানো না এই লেটারগুলোর অর্থ কি? তুমি যদি জানতে চাও তাহলে সামনে এগিয়ে যাও। কোরআনে কি বলা হয়েছে সেটার উপরে তুমি ফোকাস করো।