Transcription
১৯৪৯ সালের ২৯শে আগস্ট তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত কাজাকিস্তানের সেমি পালটেনস্ক টেস্ট সেন্টারে একত্রিত হয়েছেন দেশটির গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারকরা। কন্ট্রোল রুমে বসে অধীর আগ্রহে সবাই অপেক্ষা করছেন একটি বিশেষ অস্ত্র সম্পর্কে জানতে। অস্ত্রটির সাংকেতিক নাম আরডিএস ওয়ান। সোভিয়েত ইউনিয়নের বানানো প্রথম পারমাণবিক বোমা। তবে এটি আদৌ কাজ করবে কিনা তা জানা যাবে কেবল এর সফল বিস্ফোরণ ঘটানোর পর।
কিছুক্ষণ পরেই এক বিকট শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠলো জমিন। ধোঁয়ার কুন্ডলীতে ছেয়ে গেল আকাশ। দূরের গ্রামবাসীরা ভাবলো হয়তো বড় কোন ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে। এদিকে টেস্ট সেন্টারের সকলেই মেতে উঠলো বিজয়ের উল্লাসে। তাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম হয়েছে সফল। এখন সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতেও আছে পারমাণবিক বোমা।
মুহূর্তেই খবর পৌঁছে গেল যুক্তরাষ্ট্রে। তারা ভেবেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তত ১০ বছর লাগবে পরমাণু বোমা তৈরির কঠিন পদ্ধতি আবিষ্কার করতে। এত অল্প সময়ে রুশ বিজ্ঞানীরা কি করে করল এই কাজ? মার্কিন প্রশাসন যেন তা বিশ্বাসই করতে পারছিল না। তবে কি চুরি হয়ে গেছে আমেরিকার পরমাণু গবেষণার তথ্য? মার্কিন প্রশাসন দ্রুতই শুরু করল অনুসন্ধান। তদন্তে চোখ কপালে উঠে গেল তাদের। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরমাণু বোমা আরডিএস ওয়ান হুবহু নাগাসাগিতে ফেলা এটম বোমা ফ্যাটম্যানের নকল।
আদ্যবান্ধরা, আজকের পর্বে জানবো কিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমা আবিষ্কারের অল্প সময় পরেই পরমাণু বোমা তৈরি করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, যা পরবর্তীতে দুই দেশকে জড়িয়ে ফেলেছিল এক দীর্ঘমেয়াদী স্নায়ু যুদ্ধে।
পরমাণু বোমার প্রধান উপাদান ইউরেনিয়াম নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন গবেষণা শুরু করেছিল সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই। পাশাপাশি জার্মানি, আমেরিকা ও ব্রিটেনেও একই সময় শুরু হয়েছিল এই গবেষণা। তবে কোন দেশই নিশ্চিতভাবে অবগত ছিল না এ ধরনের বোমা কতটা কার্যকরী হবে সে বিষয়ে। তাই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দেখা মেলে ১৯৪০ সালের আগ পর্যন্ত।
এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছড়িয়ে পড়ে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে। তাই স্টালিনের পক্ষে যুদ্ধ রেখে নতুন সমরাষ্ট্র উদ্ভাবনে সময় ব্যয় করা ছিল বোকামি। যার দরুণ পরমাণু প্রকল্পসহ বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত সকল বিজ্ঞানীদের নিয়োগ করা হয় নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী সহ যুদ্ধের নানান গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার কাজে।
১৯৪২ সালের সেই সময়ে সোভিয়েত আমলের নামকরা বিজ্ঞানী জর্জি ফ্লাইরোফ পরমাণু প্রকল্প নিয়ে পশ্চিমাদের সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করেন। তিনি খেয়াল করেন হুট করে আমেরিকা ও ব্রিটেনে পরমাণু বিষয়ক রিসার্চ পেপার প্রকাশিত হচ্ছে না। তার মানে নিশ্চয়ই তারা গোপনে বড় কোন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। একদমই দেরি না করে ফ্লাইরুভ চিঠি লিখে জোসেফ স্টালিনকে তার সন্দেহের কথা জানান। স্টালিন প্রথমে আমলে না নিলেও পরে গোয়েন্দা তথ্য যাচাই করে জানতে পারেন ফ্লাইরোবের ধারণাই ঠিক। তাই বিশ্বযুদ্ধের বিপদ সংকুল সময়েও তোরজোর করে চালু করেন পরমাণু অস্ত্রের প্রোগ্রাম, যার দায়িত্ব অর্পণ করা স্টালিনের বিশ্বস্ত পদার্থ বিজ্ঞানী আইগোর কুরচেটোফের উপর।
দেখতে দেখতে কেটে যায় কয়েক বছর। বিশ্বযুদ্ধে জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় মিত্র বাহিনীর দেশগুলো। এসময় ১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোমান জোসেফ স্টালিনের সাথে এক সাক্ষাতের সময় বলেন, জাপানকে ধ্বংস করে দেয়ার মতো একটি নতুন অস্ত্র তাদের হাতে আছে, যা স্পষ্টতই ছিল পরমাণু অস্ত্রের ইঙ্গিত। স্টালিনেরও বুঝতে বাকি ছিল না সে কথা। তবে সেদিন তিনি এমন ভান করেন যে তাদের সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু যায় আসে না। বরং স্টালিনও আরো বলে দিলেন, কি সেই অস্ত্র তা জানার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো ভাবে জাপানকে পরাজিত করা।
এরপর একই বছরের আগস্ট মাসে আমেরিকা লিটল বয় ও ফ্যাটম্যান পরমাণু বোমা দিয়ে আঘাত হানে জাপানে। পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দেয় তাদের কাছে এমন এক অস্ত্র আছে যার মাধ্যমে নিমিষে ধ্বংস করে ফেলা যায় একটি গোটা শহর। যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমা লিটল বয় ছিল ইউরেনিয়াম ২৩৫ তৈরি। সোভিয়েত ইউনিয়ন আটকে ছিল মূলত এখানেই। তারা কিছুতেই ইউরেনিয়াম ২৩৮ থেকে ইউরেনিয়াম ২৩৫ আলাদা করার পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারছিল না। নাগাসাকিতে ফেলা ফ্যাটম্যান বোমাটি ছিল আবার প্লুটোনিয়াম দ্বারা তৈরি। অবশ্য প্লুটোনিয়ামও বের করতে হয় ইউরেনিয়াম শুদ্ধিকরণের মাধ্যমে। তবে ইউরেনিয়াম থেকে প্লুটোনিয়াম শুদ্ধিকরণ তুলনামূলক সহজ। তবে এর জন্য প্রয়োজন ছিল প্রচুর পরিমাণ ইউরেনিয়াম।
ইউরেনিয়ামের যোগান নিয়ে অবশ্য বিশেষ বেগ পোহাতে হয়নি সোভিয়েত রাশিয়াকে। জার্মানি আত্মসমর্পণের পর সেখান থেকে প্রচুর পরিমাণ ইউরেনিয়াম জব্দ করে সোভিয়েত সেনারা। সেই সাথে একদল জার্মান বিজ্ঞানীকেও আটক করা হয়। ফলে তাদের সহায়তায় কিছুটা বেগবান হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের পরমাণু প্রোগ্রাম।
১৯৪৫ সালে স্টালিন পরমাণু প্রোগ্রামের সকল দায়-দায়িত্ব অর্পণ করেন এন কেভি ভিডি অফিসার লাভরেন্তি বেরিয়ার উপর। কাজেই একজন গোয়েন্দা সংস্থার অফিসারকে যখন পরমাণু প্রোগ্রামের দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন আমেরিকার অভ্যন্তরে শুরু হয় গুপ্তচর বৃত্তি। অবশ্য রুশ গোয়েন্দারা অনেক আগে থেকেই সক্রিয় আমেরিকায়। মূলত মার্কিন কমিউনিস্টদের কাজে লাগিয়ে তারা আমেরিকা থেকে বিভিন্ন তথ্য হাতিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করেছিল অনেক আগেই। এমনকি বিশেষ কয়েকজন রুশ গুপ্তচরকে এমন ভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল যারা কিনা সুকৌশলে আমেরিকার পরমাণু গবেষণার প্রোগ্রাম ম্যানহাটন প্রজেক্টে কর্মরত হচ্ছিল।
এদের মাঝে সোভিয়েত গুপ্তচর ডেভিড গ্রীনগ্লাসের নাম বিশেষ আলোচিত, যিনি মূলত তার বোন ইথেল রোজেনবার্গ ও বোনের স্বামী জুলিয়াস রোজেনবার্গ এর মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নের গোয়েন্দা সংস্থার সাথে যোগ সাজস গড়ে তোলেন। এরপর নিয়মিত রুশদের কাছে পাঠাতে শুরু করেন আমেরিকার পরমাণু বোমার ডিজাইনসহ বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি সোভিয়েত ইউনিয়নকে সরবরাহ করে ম্যানহাটন প্রজেক্টের তরুণ পদার্থ বিজ্ঞানী থিওডর হাল। তার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা সোভিয়েত পরমাণু প্রোগ্রামের গিট খুলে যায়। তারা অবশেষে জানতে পারে কিভাবে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ও গ্যাসীয় ডিফিউশন পদ্ধতির মাধ্যমে ইউরেনিয়াম ২৩৮ থেকে ইউরেনিয়াম ২৩৫ আলাদা করা যায়। সেই সাথে নাগাসাকিতে ফেলা ফ্যাটম্যান বোমার সকল তথ্য সোভিয়েত গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দেন থিয়েটর হাল। অথচ এগুলো আবিষ্কার করতে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়েছিল আমেরিকাকে, এমনকি গবেষণার সাথে জড়িত অনেককে জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত নিতে হয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন শুধুমাত্র বিশ্বস্ত কয়েকজন গুপ্তচরকে দিয়ে এমন সব দূরহ কাজ করিয়ে নেয়। ফলে তাদের অর্থশ্রমের পাশাপাশি বেঁচে যায় অনেক সময়।
এছাড়াও অস্কার সেবরার ও রুসেল নামের দুজন সোভিয়েত গুপ্তচর ইউরেনিয়াম শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার যন্ত্রাংশ ও পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সাহায্য করেছিলেন। তবে বেশিদিন তারা গুপ্তচর বৃত্তির কাজ চালিয়ে যেতে পারেননি। জুলিয়াস রোজেনবার্গ, ইথেল রোজেনবার্গ ও ডেভিড গ্রিনস ধরা পড়েন আমেরিকার হাতে। অস্কার সেবডার পালিয়ে চলে আসেন সোভিয়েত ইউনিয়নে। অন্যদিকে থিয়েটার হালকে রাখা হয় কঠোর নজরদারীতে। প্রথমদিকে তিনি গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগ অস্বীকার করলেও কিছুদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে তা স্বীকার করেছিলেন তিনি।
আমেরিকা পরবর্তীতেও তাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রাখে। এমনকি তাদের নিজস্ব পরমাণু প্রোগ্রামের মূলনায়ক ওপেন হেইমার কেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, রাখা হয় বিশেষ নজরদারীতে। পরে অবশ্য আমেরিকার পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয় যে ওপেন হেইমার সোভিয়েত গুপ্তচরদের কেউ ছিলেন না।
সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের প্রথম পরমাণু বোমার সফল পরীক্ষা চালানোর পর আমেরিকার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল ঠিক তেমন যেমনটা হিরোশিমা হাতে পরমাণু বোমা ফেলার পর হয়েছিল। সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান জোসেফ স্টারলিনের এটা ঠিক যে আমেরিকাও জানতো সোভিয়েত ইউনিয়ন আবিষ্কার করবে পরমাণু বোমা। তবে ম্যানহাটন প্রজেক্টে নিজেদের গুপ্তচর ঢুকিয়ে দিয়ে যে এত দ্রুত তথ্য চুরি করে নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন কাজটা করে ফেলবে তা রীতিমত ভাবনার বাইরেই ছিল। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি তথ্য চুরির দায় স্বীকার করেনি, তবে তাদের প্রথম পরমাণু বোমা আরডিএস ওয়ান এর ডিজাইন দেখলে সহজেই বোঝা যায় এটি আমেরিকার ফ্যাটম্যান বোমারই নক ছিল।
এদিকে রুশদের এমন অর্জনে আমেরিকাও হাত গুটিয়ে বসেছিল না। বরং আবারো তারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে পেছনে ফেলতে আধা জল খেয়ে নামে থার্মো নিউক্লিয়ার উইপন বা হাইড্রোজেন বোমা বানানোর কাছে। ফলে দুই পরাশক্তির মাঝে শুরু হয় ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের এক ঘৃণ প্রতিযোগিতা, যা চলে টানা কয়েক দশক ধরে। ইতিহাসে যা স্নায়ু যুদ্ধ নামে পরিচিত এবং এতে করে বেশ কয়েকবার দেখা দেয় পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কাও। যদিও শেষ পর্যন্ত সম্মুখর মুখোমুখি হয়নি দুপক্ষ, তবে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতির কোন কমতি রাখেনি কেউই।
দুই দেশে এত বছর ধরে নিজেদের পরমাণু বোমার মজুদ বাড়িয়ে চলেছে কেবল। বর্তমানে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরী রাশিয়ার হাতে যে পরিমাণ পারমাণবিক বোমা রয়েছে, সেগুলো এই দুই দেশ তো বটেই, বরং পুরো পৃথিবী ধ্বংসস্তপে পরিণত করার ক্ষমতা রাখে। অদূর ভবিষ্যতে যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগেই যায় আর এই দুই দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করে ফেলে, তবে বলা যায় পুরো পৃথিবী নিমিষে ধ্বংস হয়ে যাবে, মুখ থোবড়ে পড়বে এতদিন ধরে তিল তিতিল করে গড়ে তোলা মানব সভ্যতা। [মিউজিক]