Transcription
2003 সালের এপ্রিল মাস। আমেরিকার নেতৃত্বে ইরাক যুদ্ধ মাথাচাড়া দিয়ে বসেছে। টমাহ মিসাইল, ফাইটার জেট আর ট্যাংকের নিচে গুড়িয়ে যাচ্ছিল বাগদাদের সাজানো শহর। আর ঠিক সেই মুহূর্তে যখন সবাই ধরেই নিয়েছে সাদ্দাম হোসেন হয়তো ধরা পড়বেন বা নিহত হয়েছেন। ঠিক তখনই ঘটে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। ইরাকের প্রেসিডেন্ট প্যালেস ধ্বংস হয়ে গেল। সরকারও ভেঙ্গে পড়ল কিন্তু সাদ্দাম তিনি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন।
তারই শুরু হোসেন ছিলেন এমন একজন মানুষ যার ছায়া একসময় কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে, যার নাম শুনলেই শিউরে উঠতো শত্রুরা আর তার রাজনীতির ধাদায় বিভ্রান্ত হতো বড় বড় রাষ্ট্রনেতারা। তিনি 1979 সাল থেকে 2003 সাল পর্যন্ত দীর্ঘ 24 বছর ইরাকের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। একটা সময় ছিল যখন আমেরিকার বন্ধু হিসেবেই বিশ্বমঞ্চে আবির্ভাব হয়েছিল এই নেতার। কিন্তু সময় বদলায় এবং সেই সাথে পরিস্থিতিও পাল্টে যায়। আর আমেরিকার একসময়ের মিত্র সাদ্দাম হোসেন হয়ে ওঠে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।
তার শাসন আমলে ইরাক দেখেছে একদিকে আধুনিকায়নের চেষ্টা। আবার অন্যদিকে ভয়াবহ যুদ্ধ বিগ্রহ। তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধের মূল নায়ক। আবার কুয়েতে আক্রমণের জন্য আন্তর্জাতিক ধিক্কারপ্রাপ্ত এক নায়ক। তার বিরুদ্ধে উঠেছিল গণহত্যার অভিযোগ, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ। এমনকি গণবিধ্বংসী অস্ত্র গোপনে সংরক্ষণের অভিযোগ। 2003 সালে এইসব অভিযোগকে সামনে রেখেই আমেরিকা শুরু করে অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম। আর ঠিক সেই সময় থেকেই শুরু হয় এক ভয়ঙ্কর খেলা। সাদ্দাম হোসেনকে খুঁজে পাওয়ার খেলা। কোটি কোটি ডলার খরচ করে স্থানীয় গুপ্তচর এমনকি স্যাটেলাইট নজরদারির মাধ্যমে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাগুলোর একটিতে লুকিয়ে থাকা সাদ্দাম হোসেনকে খুঁজছিল আমেরিকা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো সাদ্দাম হোসেন কোথায় এবং কিভাবে লুকিয়েছিলেন? আর শেষ পর্যন্ত আমেরিকায় বা তাকে কিভাবে খুঁজে পেয়েছিল? ভিডিওর শুরুতে যেমনটা বলছিলাম, সবাই যখন ধরেই নিয়েছে সাদ্দাম হোসেন হয়তো ধরা পড়বেন বা নিহত হয়েছেন, ঠিক তখনই ইরাকের প্রেসিডেন্ট প্যালেস ধ্বংস হয়ে গেল এবং সাদ্দাম হোসেনও যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। প্রায় নয় মাস। হ্যাঁ। পুরো নয় মাস তিনি ছিলেন পুরো পৃথিবীর চোখের আড়ালে। না কোন ভিডিও বার্তা, না কোন সংবাদ, না কোন অস্তিত্বের প্রমাণ। কোন কিছুই মেলেনি তার কাছ থেকে।
বিশ্বমিডিয়াতে তখন চলছিল নানা রকম কথাবার্তা। কেউ বলছিল সাদ্দাম সিরিয়ায় পালিয়ে গেছেন। কেউ দাবি করল রাশিয়া তাকে গোপনে আশ্রয় দিয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেছিল তিনি হয়তো ইরাকেই ভূগর্ভস্থ কোন বাংকারে লুকিয়ে আছেন। যেখানে স্যাটেলাইটও নজর ফেলতে পারে না। এমনকি মার্কিন সেনাদের কাছে ধরা পড়া সাদ্দামের সবচেয়ে বিশ্বস্ত গার্ডরা পর্যন্ত বলতে পারেনি তাদের সাবেক প্রেসিডেন্ট কোথায়। এই ধাঁধার মত নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সাদ্দাম হোসেনের জন্য মার্কিন সেনারা চালায় অপারেশন রেডন, যা ইতিহাসের সবচেয়ে গোপন ও স্পেশাল অপারেশন গুলোর একটি। এমনকি মার্কিন বাহিনী একসময় পুরো তিকৃত শহরটাই ঘিরে ফেলে। কারণ ধারণা করা হচ্ছিল তিনি হয়তো নিজের জন্মস্থানেই কোথাও লুকিয়ে আছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা দিনের পর দিন চলে তল্লাশি। কিন্তু কেউ জানতো না সাদ্দাম কোথায় আছেন? তিনি কি খাচ্ছেন? কোথায় ঘুমাচ্ছেন? আদৌ বেঁচে আছেন তো? এ যেন বাস্তব জগতের কোন থ্রিলার সিনেমা যেখানে নায়ক না বরং পুরো বিশ্ব খুঁজছিল এক নিখোঁজ খলনায়ককে। কিন্তু তারপর যা ঘটেছিল তা আজও ইতিহাসের পাতায় রহস্য, বিশ্বাসঘাতকতা আর বিশ্বয়ের ছাপ রেখে গেছে।
2003 সালের শেষের দিকে মার্কিন বাহিনী তৈরি করেছিল একটি বিশেষ ডেক অফ কার্ডস। যাতে ইরাকির শীর্ষ অপরাধীদের নাম ছিল কার্ড আকারে সাজানো। সাদ্দাম ছিলেন সেই কার্ডের এইস অফ স্পেস, যার মানে তাকে ধরতেই হবে যে কোন মূল্যে। গোয়েন্দা তথ্য, উপগ্রহের নজরদারি আর স্থানীয় সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সন্দেহ করে যে সাদ্দাম তার জন্মস্থান তিকৃত শহরের আশেপাশেই কোথাও লুকিয়ে আছেন। একাধিকবার তল্লাশি অভিযান চালিয়েও পাওয়া যাচ্ছিল না তার সঠিক লোকেশন। ইরাকের প্রতিটি রাত তখনো নিস্তব্ধভাবেই কাটছিল। আর আকাশে হেলিকপ্টারের শব্দ শুনলেই লোকজন দৌড়ে পালাতো। এমন এক রাতে মার্কিন সেনাবাহিনী অভিযানের জন্য বেছে নেয় আদর নামক ছোট্ট একটি গ্রামকে। যা ছিল তিক্রিত শহর থেকে মাত্র 15 কিলোমিটার দূরে। এই গোটা অভিযানে অংশ নেয় 600রও বেশি সেনা। দুই স্কোয়াড হেলিকপ্টার, স্যাটেলাইট টিম আর বিশেষ বাহিনী। তারা ঘিরে ফেলে পুরো এলাকা। আর শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যানহান্ট। প্রতিটি ঘর বাড়ি থেকে শুরু করে উঠন বাগান এমনকি খেজুর গাছের নিচ পর্যন্ত তল্লাশি চলে কিন্তু সাদ্দামের দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না।
অবশেষে 2003 সালের 13 ডিসেম্বর। দিনটা ছিল শনিবার। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আমেরিকান সেনারা তখন তল্লাশি চালাচ্ছে আদর গ্রামের ভেতরে। হঠাৎই এক সেনার চোখে পড়ে মাটির উপর পাতলা একটা ঢাকনা। নিচে কি আছে তা কেউই জানতো না। দেখতে খুবই সাধারণ, যেন কোন কৃষক মাটির নিচে কিছু একটা রেখেছে। কিন্তু অভিজ্ঞ চোখ বুঝে যায় না এটা সাধারণ কিছু না। ঢাকনাটা সরাতেই দেখা যায় একটা সরু গর্ত। যেটা লম্বাই মাত্র ছয় ফুট আর প্রস্থে কেবল চার ফুট। মাটির নিচে কংক্রিট দিয়ে ঘেরা। এই গর্তটার নাম পরে গণমাধ্যমে স্পাইডার হোল নামে পরিচিত হয়। একজন সেনা সেই গর্তের মুখে ঝুকে পড়ে এবং চিৎকার করে বলে, "কাম আউট।" মুহূর্তের মধ্যেই গর্তের ভেতর থেকে ভারী গলায় ভেসে আসে, "আই এম সাদ্দাম হোসেন। আই এম দ প্রেসিডেন্ট অফ ইরাক এন্ড আই ওয়ান্ট টু নেগোশিয়েট।"
পুরো ইউনিট থমকে যায়। এতদিন যে লোকটাকে ধরার জন্য কোটি ডলার খরচ হয়েছে, শত শত গোয়েন্দা নিয়োজিত হয়েছে, সে কিনা শেষমেষ মাটির নিচের এক সাধারণ গর্ত থেকে বেরিয়ে আসছে। যদি বিশাল বড় কোন বাংকার হতো তাহলেও মানা যেত। কিন্তু এমন কোন জায়গায় সাদ্দাম হোসেনকে পাওয়া যাবে সেটা কিছুতেই মার্কিন সেনাবাহিনী মানতে পারছিল না। অবশেষে সাদ্দাম হোসেনকে গর্ত থেকে টেনে তোলা হয়। মাথায় উষ্ক খুস্ক চুল, মুখ ভর্তি লম্বা লম্বা দাড়ি, পরণে সাধারণ পোশাক। কেউ যেন তাকে দেখে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে এই লোকটাই একসময় ইরাকের প্রেসিডেনশিয়াল প্যালেসে সোনামন্ডিত সিংহাসনে বসতেন। সাদ্দামকে তখনই নিয়ে যাওয়া হয় এক অস্থায়ী ঘাটিতে। সেখানেই তার মুখের গোফiri কেটে তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। সেই সময়ের একটা বিখ্যাত ভিডিও প্রকাশিত হয়, যেখানে সেনারা তার মুখের টর্চ লাইট ধরে দাঁতের ভেতর খুঁজছে যে কোন সায়ানাইড ক্যাপসুল আছে কিনা। তার সঙ্গে পাওয়া গিয়েছিল দুটি একে 47, একটি পিস্তল এবং প্রায় 7 লাখ 50000 মার্কিন ডলার। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল তিনি একটি গুলিও চালাননি।
এই দৃশ্যটা ছিল বিশাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক সমাপ্তি। একসময়ের রাজা যিনি যুদ্ধের দামামা বাজাতেন তাকেই কিনা মাটির নিচের গর্তে লুকিয়ে থাকতে হল। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বললেন মাত্র তিনটা শব্দ। কিন্তু এই তিনটা শব্দই গোটা বিশ্বের রাজনীতিতে এক ভূকম্পন সৃষ্টি করে দিয়েছিল। আমেরিকায় ছিল বিজয়ের উল্লাস। মিডিয়াতে চলছিল 24 ঘন্টা সরাসরি সম্প্রচার। আর বিশ্বজুড়ে চলছিল আলোচনার ঝড়। কিন্তু ইরাকের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। অনেকেই রাস্তায় নেমে আনন্দ উদযাপন করে। সাদ্দামের মূর্তি গুড়িয়ে দেয়। আবার কেউ কেউ চোখের পানি ফেলে বলে সাদ্দাম হোসেন আমাদের নেতা ছিলেন। আর আমেরিকা আমাদের সম্মান নষ্ট করেছে।
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়। 2003 সালে ধরা পড়ার পর সাদ্দাম হোসেনকে ইরাকের একটি গোপন সামরিক স্থাপনায় আটক রাখা হয়। বছরের পর বছর ধরে চলা তদন্ত, সাক্ষ্য গ্রহণ আর প্রমাণ বিশ্লেষণের পর শুরু হয় তার বিচার। 1982 সালে দুজাইল নামক এক গ্রামে 148 জন শিয়া মুসলিমকে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয় তার বিরুদ্ধে। শুধু এই অভিযোগেই নয়, তার শাসন আমলে হাজারো মানুষ নিখোঁজ হয়েছিল। গোপন কারাগারে বন্দী হয়ে গিয়েছিল কিংবা গণকবরে পরিণত হয়েছিল। 2006 সালের 5ই নভেম্বর তাকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর সাদ্দাম একটিবারও চিৎকার করেননি। বরং চুপচাপ শুনে গেছেন রায়। ঠিক যেন একজন যোদ্ধা যিনি জানেন লড়াই শেষ। আর এখন শুধু হিসেব-নিকেশের সময়।
অবশেষে 2006 সালের 30শে ডিসেম্বর। ইসলামিক ঈদুল আযহার ঠিক আগের দিন। ইরাকের স্থানীয় সময় সকাল ছয় টায় মৃত্যুর আদেশ বাস্তবায়ন করা হয়। জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনি বলেছিলেন আল্লাহু আকবার এবং মুখে কালেমা পাঠ করেছিলেন। সাদ্দামের মৃতদেহ পরবর্তীতে ইরাকের তিকৃত শহরের কাছে তার পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। কিন্তু সবচেয়ে আলোচিত হয়ে ওঠে তার মৃত্যুর সেই ভিডিও। যা গোপনে মোবাইলে ধারণ করা হয়েছিল। ভিডিওতে দেখা যায় কিছু ব্যক্তি মৃত্যুর আগে তাকে কটাক্ষ করছে। কেউ কেউ শিয়া নেতা মুক্তাদা আল সদরের নাম নিচ্ছে। এতে বিতর্ক ছড়ায় বিশ্বজুড়ে। সেদিন ইরাকেও ছিল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেকেই ফাঁসিকে স্বাগত জানায়। আবার অনেকেই প্রশ্ন তুলেন যদি বিচারি হয় তবে কেন ছিল গোপন ভিডিও? কেন এত তাড়াহুড়ো করে ঈদের আগের দিনেই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো।
সাদ্দাম হোসেন ছিলেন এমন একজন শাসক যিনি একসময় মধ্যপ্রাচ্যের কাছে সবচেয়ে আতঙ্কিত নাম ছিলেন। আবার অনেকের কাছেই ছিলেন এক সাহসী দেশপ্রেমিক। কিন্তু প্রশ্ন একটাই। সাদ্দাম হোসেনের সেই করুণ পরিণতি আদৌ কি ছিল ন্যায়বিচার? আমেরিকার দাবি তো ছিল ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্র। অথচ সেই অস্ত্র আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাহলে প্রশ্ন জাগে যুদ্ধটা কি সত্যিই ছিল নিরাপত্তার জন্য? নাকি ছিল রাজনীতিরই এক ঠান্ডা খেল। 2003 সাল থেকে 2006 এই তিন বছর সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে চলেছে এক নাটকীয় ট্রায়াল। যেখানে তার বিরুদ্ধে আনা হয় যুদ্ধপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। কিন্তু সেই বিচারি বা কতটা স্বচ্ছ ছিল? আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলেন, "ইট ওয়াজ মোর এবাউট রিভেঞ্জ দেন জাস্টিস।" আজও ইরাকের বহু মানুষ বিশ্বাস করে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পরেই শুরু হয়েছে দেশটির বিশৃঙ্খলার এক দীর্ঘ অধ্যায়। অন্যদিকে অনেকেই মনে করেন তিনি ছিলেন এক নিষ্ঠুর স্বৈরাচার যার পতন হওয়াই উচিত ছিল।
এবার আপনিই বলুন সাদ্দাম হোসেন কি একজন সাহসী নেতা ছিলেন? তার বিচার কি আদৌ ছিল ন্যায়সঙ্গত? না শুধুই আমেরিকান রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। আপনার উত্তর কমেন্টে লিখে জানাতে পারেন। তো দেখা হচ্ছে পরবর্তী ভিডিওতে। ততক্ষণ পর্যন্ত সাবস্ক্রাইব করে জ্ঞানচিত্রের সাথেই থাকুন।