📱

Get Our Mobile App

Take your business learning on the go!

Download on the App StoreGet it on Google Play

হঠাৎ ৩৭ বছর পর যখন বিমানটি ফিরে আসে তখন সবাই অবাক হয়ে যায় | Mystery of Flight 914 | ADVUT 10

ADVUT 1015:40

Transcription

হে বন্ধুরা, কল্পনা করুন আপনি একটি ফ্লাইটে উঠলেন, সিটবেল্ট বাঁধলেন, আর জানলার বাইরের মেঘ দেখতে দেখতে আপনার একটু চোখ লেগে এল। কিন্তু যখন ঘুম ভাঙলো এবং বিমানটি ল্যান্ড করল, আপনি দেখলেন জানলার বাইরের পৃথিবীটা এক লাফে ৩৭ বছর এগিয়ে গেছে। এদিকে আপনার বয়স একদিনও বাড়েনি, কিন্তু আপনি যে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন, তা আপনার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। শুনতে সাইন্স ফিকশন বা একটু একটু অদ্ভুত লাগলেও, ঠিক এমনটাই ঘটেছিল প্যান এম ফ্লাইট ৯১৪ এর সাথে। এটি এমন একটি বিমান, যা পাঁচ বা ১০ বছর নয়, বরং দশকের পর দশক নিখোঁজ থাকার পর ফিরে এসেছিল।

আজ অদ্ভুত দশের এই রোমাঞ্চকর এপিসোডে, আমরা শুধু ফ্লাইট ৯১৪ এর সেই রহস্যময় অন্তর্ধানের গল্পই জানবো না, বরং ফরেন্সিক ডিটেকটিভের মতো তদন্ত করে দেখবো, পুরো ঘটনাটি কি সত্যিই ঘটেছিল, নাকি এটি স্রেফ একটি সাজানো গুজব।

হোক গল্পের শুরুটা হয় দোসরা জুলাই, ১৯৫৫ সালে। নিউইয়র্ক সিটি থেকে মায়ামি, ফ্লোরিডার উদ্দেশ্যে একটি ডগলাস ডিসি-ফোর বিমান নিজের যাত্রা শুরু করে। বিমানে ছিলেন ৫৭ জন যাত্রী এবং ছয় জন ক্রু সদস্য। সেই দিনের সকালটা আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই ছিল। মিয়ামিতে পৌঁছাতে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময় লাগার কথা। ক্যাপ্টেন মিগুয়েল ভিক্টরি রিয়ানো এবং তার ক্রু একটি মসৃণ টেকঅফের পর বিমানটিকে ক্রুজিং উচ্চতায় নিয়ে যান এবং নিয়মিত কাজ—মানে যন্ত্রপাতি পর্যবেক্ষণ, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সাথে যোগাযোগের কাজে মন দেন।

কিন্তু এরপরেই ঘটে এক অভাবনীয় ঘটনা। কোন পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই, ফ্লাইট ৯১৪ নিউইয়র্কের রাডার স্ক্রিন থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা মরিয়া হয়ে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন, কিন্তু অন্য প্রান্ত থেকে কেউ সাড়া দিচ্ছিল না। কয়েক ঘন্টা পর, সামরিক জেট এবং কর্মীদের বিমানের সর্বশেষ পরিচিত অবস্থান অনুসন্ধানের জন্য পাঠানো হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার একটি উদ্ধারকারী দল পাঠায়, যারা দিনের পর দিন আটলান্টিক আশেপাশের পাহাড় এবং উপত্যকায় ব্যাপক তল্লাশি চালায়। তারা ধ্বংসাবশেষ, বেঁচে থাকা কোন মানুষ অথবা অন্ততপক্ষে একটি ছোট্ট সূত্র খুঁজে পাওয়ার আশা করছিল। যাত্রীদের পরিবারগুলো চরম যন্ত্রণার মধ্যে দিন পার করছিল, এই আশায় বুক বেঁধেছিল যে তাদের প্রিয়জনেরা হয়তো এখনো বেঁচে আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা কিছুই পায়নি। মনে হচ্ছিল যেন একটি বিমান স্রেফ বাতাসে মিলিয়ে গেছে। মাস গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে, এই ঘটনাটিকে বিমান চলাচলের ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্য হিসাবে চিহ্নিত করে তল্লাশি স্থগিত করা হয়।

কিন্তু আসল টুইস্ট এখনো বাকি। গল্পটি এখানেই শেষ হতে পারতো, কিন্তু তা হয়নি। ১৯৫৫ সালের নিখোঁজ হওয়া এই বিমানটি ৩৭ বছর পর, ঠিক ৯ই সেপ্টেম্বর, ১৯৯২ সালে ভেনিজুয়েলার কারাকাসে পৌঁছায়।

[মিউজিক]

১৯৯২ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর, কারাকাসের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা দৈনন্দিন কাজ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তখন হঠাৎ তাদের রাডারে একটি পুরনো প্রোপেলার চালিত বিমান ভেসে ওঠে। এটি যেন হঠাৎ করেই আবির্ভূত হয়েছিল, যার ফলে কন্ট্রোল টাওয়ারে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। তারা যখন এই অচেনা পাইলটের সাথে যোগাযোগ করেন, পাইলট উত্তর দেন, "এটি প্যান এম ফ্লাইট ৯১৪, অবতরণের অনুমতি চাইছি।" একবার ভাবুন তো, কন্ট্রোল রুমে বসে থাকা মানুষগুলোর মনের অবস্থা! এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা এতটাই হতবাক হয়েছিল যে তারা কথা বলতে পারছিল না, কারণ বিমানের আইডেন্টিফিকেশন নাম্বারটি প্রায় ৩৭ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া সেই বিমানের সাথেই হুবহু মিলে যায়। সংশয় তখন অবিশ্বাসের রূপ নেয়, যখন বিমানটি সত্যিই অবতরণ করে। গ্রাউন্ড ওয়ার্কাররা বিমানের জানলার ওপারে যাত্রীদের দেখতে পান। চমকে দেওয়ার মত বিষয় হলো, তাদেরকে বয়স্ক দেখাচ্ছিল না বা তাদের বয়স বেড়েছে বলেও মনে হচ্ছিল না। তিন দশক আগে নিখোঁজ হওয়া বিমানটি একদম অক্ষত অবস্থায় তাদের চোখের সামনে দাঁড়িয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যাত্রীরা বিশ্বাস করছিল যে তারা এখনো মিয়ামির পথেই আছে। সময় যে পেরিয়ে গেছে, সে সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র কোন ধারণা ছিল না। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকরা ছুটে আসেন। কিন্তু ঠিক তখনই পাইলট একটি ছোট্ট ক্যালেন্ডার সামনে নিয়ে আসেন, যেন দিনটি কি তা পরীক্ষা করে দেখছেন। দেখবার পরে সেটিকে জানলার বাইরে ফেলে দেন। হঠাৎ করেই বিমানের প্রপেলারগুলো ঘুরতে শুরু করে এবং পাইলট রানওয়ে দিয়ে আকাশে উড়ে যান। আর কখনো তাকে দেখা যায়নি।

দাঁড়ান, গল্পের আরো একটি ভার্সন আছে। কিছু সংস্করণে বলা হয়, পাইলট উড়ে যাননি। গ্রাউন্ড কন্ট্রোল যাত্রীদের নিরাপদে বিমান থেকে বের হতে সাহায্য করে। বিভ্রান্ত ও দিশেহারা যাত্রীদের ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। যখন পাইলটকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে তিনি কিভাবে ভেনিজুয়েলার আকাশ সীমায় এলেন, তার কোন উত্তর তার কাছে ছিল না। তার মতে, এক মুহূর্তে তিনি সেখানে ছিলেন এবং পরের মুহূর্তেই তিনি এখানে চলে এসেছেন। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং অবর্ণনীয় ব্যাপার কি জানেন? ৩৭ বছর পরেও বিমানটিতে কোন আঁচড় ছিল না, কোন দাগ ছিল না। মনে হচ্ছিল যেন বিমানটিকে একটি টাইম ক্যাপসুলে সংরক্ষণ করা হয়েছে। আর যাত্রীরা তাদের বার্ধক্যের কোন লক্ষণই ছিল না। মুখে কোন বলিরেখা ছিল না। তাদের পোশাক এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র যেন সময়ের স্রোতে জমেছিল।

তাহলে বিমানটি এতগুলো বছর কোথায় ছিল? যাত্রীদের বয়স কেন বাড়লো না? এটি কি কোন টাইম ট্রাভেলের ঘটনা? নাকি এলিয়েনদের কাজ? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোন ডার্ক সিক্রেট? রহস্যের গন্ধ পেয়ে বিশ্বজুড়ে মিডিয়া, সাংবাদিক এবং ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা কারাকাসে ছুটে আসেন। এতগুলো বছর পর ফিরে আসা পরিবারের সদস্যের কান্না, আনন্দ আর অবিশ্বাস মিলে এক অদ্ভুত আবেগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আসল প্রশ্নটা তখনো সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল—এই ৩৭টা বছর বিমানটি গেল কোথায়?

এই গল্প সম্পর্কে সবথেকে জনপ্রিয় তত্ত্বগুলোর মধ্যে একটি হলো, ফ্লাইট ৯১৪ সরাসরি সময়ের একটি অদ্ভুত অঞ্চলে বা ওয়ার্ম হোলে প্রবেশ করেছিল, যা এটিকে ৩৭ বছর ভবিষ্যতে পাঠিয়ে দেয়। অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এই তত্ত্বকে সমর্থন করে, কারণ এই তত্ত্ব বলে যে পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে সময় ধীর বা দ্রুত চলতে পারে। আইনস্টাইনের মতে, সময় শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে ধীরগতিতে চলে। এই তথ্যকে যদি আমরা এই ঘটনার সাথে সাজাই, তাহলে দৃশ্যপথটি এইরকম: ফ্লাইট ৯১৪ যখন ওয়ার্ম হোলে প্রবেশ করে, তখন তীব্র আকর্ষণীয় ক্ষেত্রের কারণে যাত্রী ও ক্রুরা চরম টাইম ডাইলেশন বা সময়ের প্রসারণ অনুভব করেন। এদিকে বাইরের একজন পর্যবেক্ষকের কাছে মনে হবে বিমানটি ১৯৫৫ সালে অদৃশ্য হয়ে গেছে, যেখানে বিমানের ভেতরের মানুষদের জন্য সময় কেবল ধীরগতিতে পার হচ্ছিল।

কিন্তু আবার অনেকেই মনে করেন, এলিয়েনদের হয়তো আমাদের ভিন্টেজ কালেকশনের ডিসি-ফোর বিমানটা পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। মজা করছি না। অনেকেই সত্যি এটা বিশ্বাস করেন। ১৯৫০ এর দশকে মানুষ আকাশে অদ্ভুত সব বস্তু দেখেছিল। যারা এই তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, তারা মনে করেন যে বিমানটিকে একটি এলিয়েন মহাকাশ যানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবার পর তাদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার সময়কার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন যে তারা আকাশে অনেক হোভারক্রাফট দেখেছিলেন। সবথেকে বড় বিষয় হলো, নিখোঁজ থাকা বছরগুলোতে কি ঘটেছিল, তা যাত্রী [মিউজিক] বা ক্রুরা ঠিক মনে করতে পারেননি, যা ইউএফও অপহরণের ঘটনাগুলোর একটি খুব সাধারণ থিম, যেখানে এলিয়েনরা অপহরণ করা মানুষদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় স্মৃতি মুছে ফেলে। তাই এটা বলা খুব একটা অযৌক্তিক হবে না যে, ফ্লাইট নাইন ওয়ান ফোর এর যাত্রীদের স্মৃতিও এইভাবে মুছে ফেলা হয়েছিল।

এবার ইউএফও এবং এলিয়েনদের গল্প যদি আপনার কাছে গাঁজাখুঁড়ি মনে হয়, তাহলে এবার আসল জায়গায় আসা যাক। আমেরিকার সরকার ১৯৪7 থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কোল্ড ওয়ার চলাকালীন সময়ে আমেরিকার সরকার অনেক গোপন প্রকল্প বা পরীক্ষার কাজ করেছিল। কিছু লোক মনে করেন যে, ফ্লাইট নাইন ওয়ান ফোর এই গোপন প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটি ছিল, যেখানে সম্ভবত নতুন প্রযুক্তি বা টাইম ট্রাভেলের ক্ষমতা জড়িত ছিল। ১৯৬০ এর দশকে এমওএল মানে ম্যান অরবিটিং ল্যাবরেটরি নামক ইউএস এয়ারফোর্সের একটি গোপন প্রকল্প তৈরি করা হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল একটি সামরিক মহাকাশ স্টেশন স্থাপন করা এবং উচ্চ রেজুলেশনের ক্যামেরা ব্যবহার করে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। হতে পারে প্যান এম ফ্লাইট ৯১৪ আটলান্টিকের উপর দিয়ে ওড়ার সময় একটি গোপন এমওএল মেশিনের সাথে পথ অতিক্রম করছিল এবং একটি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক অসঙ্গতির কারণে ফ্লাইটটি অদৃশ্য হয়ে যায়। মার্কিন বিমান বাহিনী হয়তো তাদের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য এই ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেয়।

এমন আরেকটি ঘটনা আমেরিকাতে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল—১৯৪৩ সালের ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট বা প্রজেক্ট রেইনবো। নৌবাহিনী সেই সময় এমন একটি নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষা করছিল, যে প্রযুক্তির মাধ্যমে ইউএসএস এলজ নামের জাহাজটি রাডারে আর ধরা পড়বে না। কিন্তু এই পরীক্ষার কারণে জাহাজটি দুটি ভিন্ন সময়কালের মধ্যে লাফিয়ে পড়ে এবং ক্রুদের ওপর এর ভয়ানক শারীরিক প্রভাব পড়েছিল। এমনকি মানুষেরা জাহাজের দেওয়ালের সাথে সেঁটে গিয়েছিল। এবার ফ্লাইট ৯১৪ এর সাথেও তো এমনটাই ঘটেছিল। বিমানটির পুনরায় আবির্ভূত হওয়ার কারণ হতে পারে প্রজেক্ট রেইনবোতে ব্যবহৃত একটি প্রযুক্তি।

কিন্তু একটা খটকা থেকেই যায়—সরকার কিভাবে এতগুলো ফ্লাইটের যাত্রীদের স্মৃতি পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারে? এর উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে আমেরিকার ইতিহাসের সবথেকে অন্ধকার এবং কুখ্যাত এক প্রজেক্টের ফাইলে—এম কে আল্ট্রা। এটি ছিল সিআইএ এর একটি গোপন প্রোগ্রাম, যার লক্ষ্য ছিল ওষুধ, হিপনোসিস এবং অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে মন নিয়ন্ত্রণের কৌশল তৈরি করা। ১৯৫০ এর দশকের গোড়ার দিক থেকে ১৯৭০ এর দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত অনিচ্ছুক মানুষদের উপর এই পরীক্ষাগুলো পরিচালিত হয়েছিল। অনেকেই মনে করেন, ফ্লাইট ৯ইন ওয়ান ফোর আসলে কুখ্যাত এম কে আল্ট্রা প্রজেক্টের এমন কোন গোপন পরীক্ষার ফাঁদে পড়েছিল, যেখানে সবার মন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য হিপনোটিজম বা ড্রাগ ব্যবহার করা হয়েছিল। যাত্রীদের স্মৃতি মুছে ফেলার এই অপারেশন মাইন্ড ওয়াইপ শেষ হওয়ার পর সরকারের একটাই কাজ বাকি ছিল—পুরো ঘটনার যাবতীয় প্রমাণ চিরতরে গায়েব করে দেওয়া।

এতগুলো তত্ত্ব, এতগুলো যুক্তি—মনে হচ্ছে যেন হলিউডের কোন থ্রিলার মুভি দেখছি। কিন্তু জানেন কি, বিজ্ঞান এই টাইম ট্রাভেল বা ওয়ার্ম হোলের তত্ত্বকে কিভাবে ব্যাখ্যা করে? মানবদেহ কি সত্যি সময়ের মধ্যে দিয়ে ভ্রমণের চাপ সহ্য করতে পারে? নাকি এই পুরো গল্পের পেছনের সত্যিটা এমন কিছু, যা আপনারা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি।

এতক্ষণ আমরা এলিয়েন, সরকারি ষড়যন্ত্র, মাইন্ড কন্ট্রোল এবং টাইম ট্রাভেলের মতো মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া তত্ত্বগুলো নিয়ে আলোচনা করলাম। কিন্তু এবার চলুন সাইন্স ফিকশন মুভির জগত থেকে বেরিয়ে একটু বাস্তবতায় ফিরে আসি। পদার্থ বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, সময় ভ্রমণ বা ওয়ার্ম হোল হলো আকর্ষণীয় ধারণা, তবে বর্তমানে আমাদের কাছে যে প্রযুক্তি রয়েছে, তা দিয়ে এটি নিশ্চিতভাবেই সম্ভব নয়। এই তত্ত্বের একটি প্রধান সমালোচনা হলো যে, একটি টাইম পোর্টাল বা ওয়ার্ম হোল তৈরি করতে বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হবে—সম্ভবত এক্সোটিক ম্যাটার, যা আমরা বর্তমানে তৈরি করার কল্পনাই করতে পারি না।

কিন্তু চলুন তর্কের খাতিরে এক সেকেন্ডের জন্য ধরে নিই যে, সময়ের মধ্যে দিয়ে ভ্রমণ করা সত্যিই সম্ভব ছিল। তাহলে বিমানে থাকা যাত্রীরা কিভাবে বেঁচে থাকতে পারলো? পদার্থ বিজ্ঞান সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণা নির্দেশ করে যে, সময়ের মধ্যে দিয়ে ভ্রমণ মানবদেহ এবং বিমান উভয়কেই চরম চাপ, মহাকর্ষীয় বল, রেডিয়েশনের প্রভাব এবং আণবিক বিচ্ছিন্নতা সহ বেশ কিছু পরিস্থিতির মুখে ফেলবে। বাস্তবে, সময় ভ্রমণের অনুমান অবস্থায় একটি স্বল্প সময়ের প্রভাবও বিমানের উপর মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলতে পারে, যেখানে মানবদেহের কথা তো বাদই দিলাম। নিজেই একটু ভেবে দেখুন—এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্লেনে ভ্রমণ করলেই আমাদের মারাত্মক জেট ল্যাগ হতে পারে। তাহলে সময়ের মধ্যে দিয়ে ভ্রমণ আপনার শরীরে কি অবস্থা করবে [মিউজিক] তা কি আপনি কল্পনা করতে পারেন? অথচ গল্প অনুসারে, ফ্লাইট ৯১৪ এর যাত্রীদের পুনরায় উপস্থিত হওয়ার পর কোন শারীরিক বা চিকিৎসাগত সমস্যা দেখা যায়নি। এখানেই কি গল্পের সবথেকে বড় ফাঁকি লুকিয়ে নেই?

কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক অসামঞ্জস্যতাগুলো এই গল্পটিকে শেষ করে দেয় না। যা এই গল্পটিকে পুরোপুরি শেষ করে দেয়, তা হলো—আমি এতক্ষণ আপনাদের যা বলেছি, তা সবই মিথ্যা ছিল। না, আমার মিথ্যা নয়। তবে এর মূল নির্মাতাদের মিথ্যা। আপনারা হয়তো ভাবছেন যে, অদ্ভুত দশ কি বলছে? এতগুলো প্রমাণ, খবরের কাগজের ক্লিপিং, রাডার ডেটা—এগুলো কি সব ভুয়াও? উত্তর হলো—হ্যাঁ।

এই ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার সময় একটি নির্দিষ্ট বিমানের মডেল ডিসি-ফোর ডগ্লাসের ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল। যাইহোক, যখন উইকলি ওয়ার্ল্ড নিউজ প্যান এম ফ্লাইটের গল্পটি তুলে ধরার জন্য এই ছবিটি ব্যবহার করেছিল, তখন দেখা যায় যে এই ছবিটি অ্যাল্যামি-তে উপলব্ধ একটি স্টক ইমেজ ছিল। অ্যাল্যামি হলো একটি জনপ্রিয় স্টক ফটো ওয়েবসাইট।

১৯৮৫ সালে চাঞ্চল্যকর এবং বানোয়াট গল্পের জন্য পরিচিত একটি ট্যাবলয়েড—উইকলি ওয়ার্ল্ড নিউজ—ফ্লাইট ৯১৪ এর অন্তর্ধান নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল। আসল পুরনো সংবাদপত্রগুলোতে আমরা দেখতে পাই যে, দুইজন ভিন্ন ব্যক্তি একই প্রত্যক্ষদর্শী বলে দাবি করেছেন, যা এই গুজবটি সাজানোর ক্ষেত্রে একটি এলোমেলো বা স্লপি কাজের প্রমাণ দেয়। পরে ব্রাইট সাইড নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে প্যান এম ফ্লাইট সম্পর্কে একটি ভিডিও আপলোড করলে গল্পটি আরো মনোযোগ আকর্ষণ করে। যদিও নিরপেক্ষভাবে বলতে গেলে, সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে তারা ভাবেনি যে কেউ তাদের গুরুত্ব সহকারে নেবে। কিন্তু এই মিথ্যে ঘটনা সবার কাছে এতটাই হিট হয়ে ওঠে যে, সবাই গল্পটিকে বিশ্বাস করতে শুরু করে। এমনকি একই সংবাদপত্র একই সূত্র ব্যবহার করে একটি নিখোঁজ বিমানের আরেকটি অনুরূপ গল্প প্রকাশ করেছিল এবং তখনও এই একই রকম ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছিল। এটি ঠিক এক মাসে টাকা ডবল হয়ে যাওয়া প্রকল্পের মতো, যেখানে মানুষ প্রকল্পটিকে অবিশ্বাস করলেও লোভে পড়ে টাকা লাগিয়ে দেয়, যা এক মাস পরেই মুখ থুবড়ে পড়ে। এক্ষেত্রেও মানুষ গল্পটিকে বিশ্বাস করে ফেলেছিল, কিন্তু দেখার চেষ্টাই করেনি এই গল্পটি কোথা থেকে এসেছে, মানে এর সোর্স আসলে কি।

আজকের ডিজিটাল যুগে এটি আমাদের জন্য একটি বিশাল শিক্ষা—শুধুমাত্র একটি বড় সংবাদ উৎস বা মিডিয়া কিছু পোস্ট করলেই তার মানে এই নয় যে এটা সত্য। আমাদের প্রাপ্ত প্রতিটি তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সর্বদা শেখা উচিত। হ্যাঁ, এটি ভীষণ ক্লান্তিকর এবং বোরিং, তবে এটি আমাদের ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে এবং সম্ভবত স্ক্যাম বা প্রতারণায় পড়া থেকে বাঁচায়। এই গল্পের প্রতিটি খুটি নাটি সংগ্রহ করবার পর, এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে প্যান এম ফ্লাইটটি ছিল কেবল একটি সুপরিকল্পিত গুজব বা ইলাবোরেট হোক।